যেসব হিসাব খোলার সময় গ্রাহক ছবিযুক্ত পরিচয়পত্রের অনুলিপি জমা দেননি, সেগুলো বন্ধ করে দিচ্ছে বিভিন্ন ব্যাংক। সম্প্রতি ইস্টার্ন ব্যাংক এমন অনেক হিসাব বন্ধ করে দিয়েছে। এছাড়া দি সিটি, ডাচ্-বাংলাসহ কয়েকটি ব্যাংকও একই উদ্যোগ নিয়েছে। তবে ছবিযুক্ত যেকোনো পরিচয়পত্র, জাতীয় পরিচয়পত্র নাকি পাসপোর্টের অনুলিপি জমা দিতে হবে, এ বিষয়ে একেক ব্যাংক একেক রকম নির্দেশনা দিচ্ছে গ্রাহকদের। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকেও নির্দিষ্ট নির্দেশনা নেই। ফলে ভোগান্তিতে পড়েছেন ব্যাংকের পুরনো হিসাবধারীরা।
ব্যাংক কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বারবার তাগিদ দেয়ার পরও ছবিযুক্ত পরিচয়পত্রের অনুলিপি জমা না দেয়ায় হিসাব অচল করে দেয়ার পন্থা অবলম্বন করতে হচ্ছে। এর মাধ্যমে গ্রাহকরা সাময়িক ভোগান্তিতে পড়লেও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ (অর্থ পাচার) আইন বাস্তবায়ন সহজ হচ্ছে, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জরিমানা থেকে রক্ষা করছে তাদের। উল্লেখ্য, কোনো ব্যাংকের বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের অভিযোগ প্রমাণ হলে তাদের জরিমানা গুনতে হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘ব্যাংকগুলো আমাদের জানিয়েছে সব হিসাবের পরিচয় নিশ্চিত করা হয়েছে। এর পরও পরিচয় না থাকার কারণে হিসাব অচল করে দেয়া হলে আমরা স্বাগত জানাই। কারণ প্রকৃত পরিচয়হীনদের কোনো ব্যাংক হিসাব থাকতে পারে না।’
জানা গেছে, ২০০৫ সালে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এক প্রজ্ঞাপনে ২০০২ সালের ৩০ এপ্রিলের আগে খোলা হিসাবগুলোর গ্রাহক-সম্পর্কিত তথ্য পূর্ণাঙ্গ করার নির্দেশনা দেয়। যেসব গ্রাহকের তথ্য হালনাগাদ করা সম্ভব হয়নি, চিঠি দিয়ে বা অন্য মাধ্যমে তাদের সঙ্গে যোগাযোগের নির্দেশনা দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হলে এসব হিসাব ‘সুপ্ত’ হিসেবে চিহ্নিত করার নির্দেশনা দেয়া হয়। এসব হিসাব থেকে গ্রাহক কোনো অর্থ উত্তোলন করতে পারে না। ব্যাংকগুলো ২০১২ সালে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে জানায়, তাদের কাছে গ্রাহকের পূর্ণাঙ্গ তথ্যবিহীন কোনো হিসাব নেই।
ইস্টার্ন, ডাচ্-বাংলা, দি সিটিসহ কয়েকটি ব্যাংক গত বছর গ্রাহকদের পরিচয়পত্র জমা দেয়ার অনুরোধ জানায়। এ সময় যেসব গ্রাহক পরিচয়পত্র জমা দেননি, তাদের হিসাব বন্ধ করে দিচ্ছে ব্যাংকগুলো। এতে ভোগান্তিতে পড়ছেন অনেক গ্রাহক। ইস্টার্ন ব্যাংক সাম্প্রতিক সময়ে এমন কয়েক হাজার হিসাব বন্ধ করে দিয়েছে। ব্যাংকটির ক্রেডিট কার্ড হিসাবের বাইরে ২ লাখ গ্রাহকের মধ্যে ২৫ শতাংশই এখন পর্যন্ত হিসাব তথ্য হালনাগাদ করেনি বলে জানা গেছে।
ইস্টার্ন ব্যাংকের ধানমন্ডি শাখার গ্রাহক আরিফুল হক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘এটিএম বুথে টাকা তুলতে গিয়ে দেখি হিসাব অচল করে দেয়া হয়েছে। একইভাবে আমার স্ত্রীর হিসাবও অচল করে দেয়া হয়েছে। নিয়মিত গ্রাহক হওয়ার পরও হিসাব অচলের আগে ব্যাংক থেকে আমাদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করা হয়নি। ব্যাংক তো জরুরি একটি সেবা, এভাবে না জানিয়ে তারা হিসাব অচল করতে পারে না।’
তবে ব্যাংকটির পরিচালন বিভাগের কর্মকর্তারা বলেন, বর্তমানে হঠাৎ করেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক গ্রাহকদের তথ্য হালনাগাদ বিষয়ে পরিদর্শনে আসছে। ফলে জরিমানার মতো শাস্তিতে পড়ারও আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে হালনাগাদহীন হিসাবগুলো অচল করার বিকল্প থাকছে না। এটা ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার অংশ হলেও বর্তমানে জোরদার করা হয়েছে।
এ বিষয়ে ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলী রেজা ইফতেফার বলেন, ‘৩১ মার্চের মধ্যে আমরা শতভাগ হিসাব হালনাগাদের উদ্যোগ নিয়েছি। আমাদের ব্যাংকে গ্রাহকের পূর্ণাঙ্গ তথ্যবিহীন কোনো হিসাব থাকবে না। আর হিসাব বন্ধ করার উদ্যোগের ফলে গ্রাহকদের থেকে হিসাব হালনাগাদে ভালো সাড়া পাওয়া যাচ্ছে।’
সিটি ব্যাংক গ্রাহকদের তথ্য পূর্ণাঙ্গ করতে অ্যাকাউন্ট ডকুমেন্টেশন আপডেট প্রজেক্ট নামে একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এতে সব শাখা ও এটিএম বুথের মাধ্যমে তথ্য পূর্ণাঙ্গ করতে গ্রাহকদের জানানো হয়। এরপর পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে তথ্য হালনাগাদ করতে গ্রাহকদের জানানো হয়। পরে শাখা থেকে প্রত্যেক গ্রাহকের সঙ্গে বিভিন্ন মাধ্যমে (মেইল-চিঠি-ফোন) যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। এরপরও ব্যাংকটির প্রায় ছয় লাখ হিসাবের মধ্যে প্রায় ১০ শতাংশের হালনাগাদ সম্পন্ন হয়নি।
এ বিষয়ে সিটি ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন বলেন, গ্রাহকদের তথ্য সংযুক্ত করতে বিশেষ প্রকল্প চলছে। এরপরও যেসব গ্রাহকের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হচ্ছে না, বাধ্য হয়েই তাদের হিসাব সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে। তবে শাখায় যোগাযোগ করে তারা হিসাব চালু করতে পারছেন।
ব্র্যাক ব্যাংক গ্রাহকদের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে যে কোনো ছবিযুক্ত পরিচয়পত্র জমা করে হিসাব হালনাগাদ করছে। এতে জাতীয় পরিচয়পত্র বাধ্যতামূলক করা হয়নি। এ বিষয়ে ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, যেকোনো ধরনের ছবিযুক্ত পরিচয়পত্র দিয়েই হিসাব খোলা যাচ্ছে। যারা এখনো তা জমা দেয়নি, তাদের সঙ্গে বিভিন্ন মাধ্যমে যোগাযোগের চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে এখনো ব্যাংক হিসাব অচল করে দেয়ার কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি।
– See more at: http://bonikbarta.com/first-page/2014/01/30/30567#sthash.rZ0Nxapo.dpuf
Discussion about this post