প্রায় দুই বছর আগে বেসিক ব্যাংকের নানা অনিয়ম ও জালিয়াতির তথ্য বেরিয়ে আসে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুসন্ধানে। এ সময় অর্থ হাতিয়ে নেয়ার পরিমাণ ছিল হাজার কোটি টাকার নিচে। এর পর ব্যাংকটির নানা অনিয়ম গণমাধ্যমে প্রকাশ হলেও কঠোর কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি। ফলে বর্তমানে অর্থ হাতিয়ে নেয়ার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা।
এমন পরিস্থিতিতে ব্যবস্থাপনা পরিচালককে (এমডি) অপসারণের একদিন পর গতকাল বেসিক ব্যাংকের তিন শাখার ঋণ কার্যক্রমও বন্ধ করে দেয়া হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত ব্যাংকটির গুলশান, শান্তিনগর ও দিলকুশা শাখায় এ কার্যক্রম বন্ধ থাকবে। এমন পদক্ষেপ বিলম্বিত হওয়ায় বেড়েছে শুধুই ক্ষতির পরিমাণ।
জানা যায়, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একাধিক প্রতিবেদনে ব্যাংকটির অনিয়মের সঙ্গে পরিচালনা পর্ষদ জড়িত থাকার বিষয়টি উঠে এসেছে। তবে এমডিকে অপসারণ করলেও পরিচালনা পর্ষদের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি বাংলাদেশ ব্যাংক। যদিও সোনালী ব্যাংকের অনিয়মের ঘটনায় পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেয়ার জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ করেছিল নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র মো. মাহফুজুর রহমান জানান, পরিচালনা পর্ষদ অপসারণের সুপারিশ বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। অনিয়ম পরিলক্ষিত হওয়ায় আইন অনুযায়ী ব্যাংকটির তিন শাখার ঋণ কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।
তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ এসব পদক্ষেপকে বিলম্বিত উল্লেখ করে বণিক বার্তাকে বলেন, এমডি অপসারণের সঙ্গে পরিচালনা পর্ষদও ভেঙে দিতে হবে। কারণ অনিয়মে পর্ষদ জড়িত থাকার বিষয়টিও উঠে এসেছে। এখন যত দ্রুত সম্ভব কেন্দ্রীয় ব্যাংককে উদ্যোগ নিয়ে পর্ষদ ভেঙে দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে; সোনালী ব্যাংকের হল-মার্ক কেলেঙ্কারির ক্ষেত্রে যেমনটি করা হয়েছিল। এমন জরুরি ও দৃশ্যমান উদ্যোগ নেয়া ছাড়া বিকল্প নেই। কারণ অন্য ব্যাংকগুলো এ থেকে শিক্ষা নিচ্ছে।
ঋণ কার্যক্রম বন্ধসংক্রান্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গতকালের চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১ (২০১৩ পর্যন্ত সংশোধিত)-এর ২৯ ও ৪৫ ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে অনিয়ম পরিলক্ষিত হওয়ায় গুলশান, শান্তিনগর ও দিলকুশা শাখায় সব ধরনের ঋণ কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ করা হলো। এর আগে যেসব ঋণ মঞ্জুর হয়েছে, কিন্তু এখনো বিতরণ সম্পন্ন হয়নি, তা বিতরণের আগে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের নির্বাহী কমিটির সভায় পূর্বানুমোদন নিতে হবে। ব্যাংকটির অন্যান্য শাখায়ও এ ধরনের অনিয়ম পরিলক্ষিত হলে অনুরূপ ব্যবস্থা নেয়া হবে।
এদিকে গতকাল ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের জরুরি সভায় ব্যাংকটির উপব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলুস সোবহানকে এমডি (চলতি) হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নথি অনুযায়ী, ২০১২ ও ২০১৩ সালে ব্যাংকের শান্তিনগর, গুলশান ও দিলকুশা শাখা থেকে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেয় কয়েকটি অখ্যাত কোম্পানি। এ ঘটনার পর কেন্দ্রীয় ব্যাংক তদন্ত করে আরো ভয়াবহ চিত্র পায়। তদন্তে বেরিয়ে আসে, ২০১৩ সালের মে মাসে শান্তিনগর শাখায় আবেদনের মাত্র নয়দিনের মধ্যে আরআই এন্টারপ্রাইজকে ১২০ কোটি টাকার ঋণ অনুমোদন দেয়া হয়। একই মাসে যমুনা এগ্রো কেমিক্যালকে আবেদনের মাত্র ১০ দিনের মধ্যে ৭৫ কোটি টাকার ঋণ অনুমোদন দেয়া হয়। এ দুটি হিসাবই খেলাপি হয়ে গেছে। একইভাবে নানা অনিয়মের মাধ্যমে গাড়ি ব্যবসায়ী ওয়াহিদুর রহমানের একাধিক প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ২৫০ কোটি টাকা ঋণ সুবিধা দেয়া হয়। খেলাপি ঋণের তথ্য গোপনসহ কোনো কোনো ক্ষেত্রে একক ঋণগ্রহীতার সর্বোচ্চ সীমাও লঙ্ঘন করা হয়। এতে ব্যাংক কর্মকর্তাদের যোগসাজশের পাশাপাশি পরিচালনা পর্ষদ জড়িত থাাকার প্রমাণ পায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
একইভাবে গুলশান শাখা থেকে শাখা ব্যবস্থাপক শিপাইর আহমেদের বিরুদ্ধে অনিয়মের মাধ্যমে ঋণ প্রদানের তথ্য বেরিয়ে আসে। শাখা থেকে ১৬টি নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ১ হাজার ৩৬০ কোটি টাকা ঋণ প্রদান, নয়টি প্রতিষ্ঠানের অনুমোদনহীন ঋণসীমা প্রদান এবং ছয়টি ভুয়া প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ঋণপত্র খুলে বিদেশে অর্থ পাচার করার সুযোগ তৈরি করে দেয়া হয়। এছাড়া ঋণ দিতে ভুয়া বন্ধক দেখিয়ে এ শাখা থেকে আরো ঋণ বিতরণ করা হয়েছে।
এসব অনিয়ম ঠেকাতে গত বছরের জুলাইয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে বেসিক ব্যাংকের সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরের পরও ঋণ প্রদানে অনিয়ম বন্ধ হয়নি। এর পর গত বছরের ২৭ নভেম্বর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন মহাব্যবস্থাপককে ব্যাংকটিতে পর্যবেক্ষক হিসেবে বসানো হলেও শৃঙ্খলা ফেরেনি।
অবশেষে গুলশান শাখায় অনিয়মের ঘটনায় বেসিক ব্যাংকের এমডিকে ব্যাংক কোম্পানি আইনের ৪৬ ধারায় কেন অপসারণ করা হবে না— এ মর্মে কারণ দর্শানোর নোটিস দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর পরিপ্রেক্ষিতে আত্মপক্ষ সমর্থনে এমডির জবাব ও ব্যক্তিগত শুনানি শেষে অপসারণের সিদ্ধান্ত হয়।
এদিকে কয়েক বছরের নিম্নমানের ব্যাংকিংয়ের কারণে ২০১৩ সালে সামগ্রিক ঋণমানের বিচারে বেসিক ব্যাংকে ধস নামে। ওই বছর রেটিং কোম্পানি ক্রেডিট রেটিং এজেন্সি অব বাংলাদেশ (সিআরএবি, সংক্ষেপে ক্র্যাব) বেসিক ব্যাংকের দীর্ঘমেয়াদে ঋণমান ‘এএ২’ থেকে ‘বিবিবি১’-এ নামাতে বাধ্য হয়। নতুন এ ঋণমানের অর্থ হলো, ব্যবসায়িক পরিবেশ ও রাজনৈতিক অস্থিরতা যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে বেসিক ব্যাংক আমানতকারী ও পরিষেবার প্রতিশ্রুতি পরিপূরণে ব্যর্থ হতে পারে।
ক্র্যাব বলছে, ২০১২ সাল শেষে ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন ও রিজার্ভের চেয়ে (টায়ার-১) নন-পারফরমিং ঋণ ১০৯ শতাংশ বেশি হয়ে গেছে। তাছাড়া অভ্যন্তরীণ দুর্বল ব্যবস্থাপনা, মূলধন প্রাপ্তি হ্রাস পাওয়া ও সম্পদের নিম্নমানের কারণে ক্র্যাব সামগ্রিকভাবে ব্যাংকটির নেতিবাচক পূর্বাভাস দিয়েছে। যদিও ব্যাংকটির তত্কালীন এমডি কাজী ফখরুল ইসলাম বণিক বার্তার কাছে ক্র্যাবের ওই প্রতিবেদনের সঙ্গে দ্বীমত পোষণ করেছিলেন।
Discussion about this post