কঠিন শর্তের বিদেশী ঋণে নিয়ম ভেঙে মূলধনি যন্ত্রের নামে হেলিকপ্টার এনেছে বেসরকারি খাতের ইস্টার্ন ব্যাংক। ইউপাস পদ্ধতি ব্যবহার করে বায়ার্স ক্রেডিটের আওতায় একটি এভিয়েশন প্রতিষ্ঠানের আমদানি করা হেলিকপ্টারের ঋণের দায় নিয়েছে ব্যাংকটি, যা বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন নীতিমালার সম্পূর্ণ লঙ্ঘন।
একইভাবে বিদেশী খাতের এইচএসবিসি, বেসরকারি খাতের প্রাইম, সাউথউস্ট ও দি সিটি ব্যাংকও নিয়ম ভেঙে এ সুবিধার আওতায় অন্য পণ্য আমদানি করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা পরিদর্শন বিভাগের এক বিশেষ পরিদর্শনে বেরিয়ে এসেছে এসব তথ্য । এসব ব্যাংককে চিঠি দিয়ে এর ব্যাখ্যা চাওয়া হলে যে জবাব পাওয়া গেছে, তাতে সন্তুষ্ট হতে পারেনি কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন নীতিমালা অনুযায়ী, দেশী ব্যবসায়ীদের বিদেশী ব্যাংকের মাধ্যমে বায়ার্স ক্রেডিট সংগ্রহ করার সুযোগ আছে। এ প্রক্রিয়ায় মূলধনি যন্ত্র ও কাঁচামাল, তেলবাহী ট্যাংকারসহ উপকূলীয় ও সমুদ্রগামী নৌযান, কৃষি যন্ত্রপাতি ও রাসায়নিক সার এবং জীবনরক্ষাকারী ওষুধ আমদানির সুযোগ রয়েছে। পণ্য ভিত্তিতে সর্বোচ্চ ৩৬০ দিনে মূল্য পরিশোধের সুযোগসংবলিত এ প্রক্রিয়ায় দেশী ব্যাংকের স্বীকৃতি প্রদানের পরই বিদেশী ব্যাংক পণ্য সরবরাহকারীদের অর্থ শোধ করে দেয়। এতে বিদেশী ব্যাংকগুলো যে সুদ আদায় করে, তা দেশী বাজারের চেয়ে অনেক কম। ফলে এসব ঋণের দিকেই ঝুঁকছেন দেশের ব্যবসায়ীরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, ইস্টার্ন ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের ট্রেড বিভাগ নিয়ম লঙ্ঘন করে বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য হেলিকপ্টার ও আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি আমদানি করেছে বায়ার্স ক্রেডিটের আওতায়। একটি এভিয়েশন প্রতিষ্ঠানের হয়ে আমদানি করা এ হেলিকপ্টারের ঋণে স্বীকৃতি দিয়েছে ব্যাংকটি। এজন্য খোলা ১৪৭৮১৩০২১৫১৮ ও ১৪৭৮১৩০২১৩১০ নম্বর ডেফার্ড ঋণপত্রের মূল্য ইউপাস পদ্ধতির আওতায় বিদেশী সরবরাহকারীকে দেয়া হয়েছে, যা নীতিমালার সম্পূর্ণ লঙ্ঘন।
তবে ইস্টার্ন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলী রেজা ইফতেখার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘হেলিকপ্টার শতভাগ মূলধনি যন্ত্র। ইউপাসের অর্থে হেলিকপ্টার আনতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কোনো আইনি বাধা নেই। আমাদের কাছে এ বিষয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। আমরাও জবাব পাঠিয়েছি।’
একই রকমের বিদেশী ঋণে প্রাইম ও সাউথইস্ট ব্যাংক তমা কনস্ট্রাকশনের পক্ষে রেলের স্লিপার ও ক্লিপ আমদানি করেছে। দি সিটি ব্যাংক এনেছে মসুর ডাল, ইস্টার্ন ব্যাংক এনেছে গম ও স্টিল বিলেট। এইচএসবিসি এসিআই লিমিটেডের পক্ষে কোলগেট টুথপেস্ট, প্রাণ গ্রুপের পক্ষে চ্যাম্পিয়ন ব্র্যান্ড টিউবলাইট, রুবি ফুড ও সিলভার ডালের পক্ষে মুসর ডাল, এমএম ইস্পাহানির পক্ষে ভারতীয় ব্ল্যাক টি, গোদরেজ হাউসহোল্ডের পক্ষে মেহেদি ও বডি স্প্রে এনেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক সাতটি ব্যাংকের ২৩টি শাখায় পরিদর্শন চালায়। এতে পাঁচটি ব্যাংকের অনিয়মে জড়িয়ে পড়ার তথ্য বেরিয়ে এসেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশী ব্যাংকগুলো পোস্ট ইম্পোর্ট ফিন্যান্সের সুদের হার ও দেশী ব্যাংকের অফশোর ব্যাংকিং ইউনিটে সুদের হার বেশি হওয়ায় ইউপাস ঋণপত্রের হার ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। ইউপাস ঋণপত্র খোলার জন্য বড় করপোরেট গ্রুপগুলো বেশি চাপ প্রয়োগ করছে। এতে দেশী ব্যাংকগুলোর অর্থ বেশি পরিমাণে অলস হয়ে পড়ছে। এছাড়া এ সুবিধায় অর্থ পাচারেরও সুযোগ তৈরি হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা এ প্রসঙ্গে বলেন, এ প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এরই মধ্যে একটি নতুন নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। জড়িত ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি আরো বেশ কিছু পদক্ষেপ নেয়া হবে।
Discussion about this post