গ্রামীণফোনের মোবিক্যাশের অনুমোদন মূলত ক্রিকেট ম্যাচ ও ট্রেনের টিকিট ক্রয়সংক্রান্ত সেবাদানের। এর বাইরে বিভিন্ন ইউটিলিটি (পরিষেবা) বিল পরিশোধের সেবা দিতে পারে প্রতিষ্ঠানটি। আর কোনো সেবার অনুমতি নেই মোবিক্যাশের। তার পরও এর মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ মোবাইল ব্যাংকিং চালু রেখেছে গ্রামীণফোন।
মোবিক্যাশের মাধ্যমে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের জন্য গ্রামীণফোনের সঙ্গে চুক্তি করেছে বেসরকারি খাতের ডাচ্-বাংলা, ওয়ান, ইউসিবিএল, মার্কেন্টাইল ও ইসলামী ব্যাংক। একটিমাত্র চুক্তির আওতায়ই মোবিক্যাশের প্রায় ৫৫ হাজার এজেন্টের মাধ্যমে সেবাটি দিচ্ছে তারা, যা মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস নীতিমালার লঙ্ঘন। কারণ নীতিমালায় সুস্পষ্ট বলা আছে, এ সেবার সঙ্গে সম্পৃক্ত প্রত্যেক এজেন্টের সঙ্গে চুক্তি করতে হবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ডিসিএমপিএস/পিএসডি/৫৭/২০১০-৪৯৫ পত্রে মোবিক্যাশের মাধ্যমে গ্রামীণফোনকে তিন ধরনের সেবার অনুমোদন দেয়। এগুলো হলো— ক্রিকেট ম্যাচ ও ট্রেনের টিকিট ক্রয় এবং পরিষেবা বিল পরিশোধ। আর মোবাইল ব্যাংকিং বিষয়ে এ-সংক্রান্ত নীতিমালায় বলা হয়েছে, এ সেবা অবশ্যই ব্যাংকের মাধ্যমে দিতে হবে। সেলফোন অপারেটররা শুধু প্রযুক্তিগত সহায়তা দেবে।
এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে গ্রামীণফোনের পক্ষ থেকে ই-মেইলে বণিক বার্তাকে জানানো হয়, সহযোগী ব্যাংকের গ্রাহকদের সেবা প্রদানের জন্য মোবিক্যাশ একটি অনুমোদিত এজেন্ট নেটওয়ার্ক। সহযোগী ব্যাংকের গ্রাহকরা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের সব ধরনের সেবা এর মাধ্যমে নিতে পারে। এর সব সেবা বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) অনুমোদিত।
বাংলাদেশে মোবাইল ব্যাংকিং চালু হয় ২০১১ সালের ৩১ মার্চ। এ-সংক্রান্ত বিধিমালা প্রণয়ন হয় একই বছরের ২০ ডিসেম্বর; মোবাইল ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনাকারী সব ব্যাংককে যা মেনে চলার নির্দেশ দেয়া হয়। নির্দেশনা ভঙ্গে লাইসেন্স বাতিল করার কথাও বলা হয়। কিন্তু মোবিক্যাশের ক্ষেত্রে এ নির্দেশনা লঙ্ঘন হয়েছে, যা নিয়ে চিন্তিত খোদ কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক দাশগুপ্ত অসীম কুমার বলেন, ‘মোবাইল ব্যাংকিং সেবায় কার কী ভূমিকা হবে, তা আমরা নির্দিষ্ট করে দিয়েছি। কেউ কেউ এর ব্যত্যয় ঘটাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। গ্রামীণফোনের মোবিক্যাশের ব্যাংকিং সেবা দেয়ার বিষয়টিও আমাদের নজরে এসেছে। কোন আইনে মোবিক্যাশের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর কাছে তা জানতে চাওয়া হবে। এর পরই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।’
মোবিক্যাশের সঙ্গে চুুক্তি করা ব্যাংকগুলোর মোবাইল ব্যাংকিং বিভাগের কর্মকর্তারা বলেন, গ্রামীণফোন থেকে তাদের আশ্বাস দেয়া হয়, মোবিক্যাশের ৫৫ হাজারের বেশি এজেন্ট রয়েছে। প্রতিনিয়ত সংখ্যাটা বাড়ছে। এর মাধ্যমে ব্যাংকগুলোর মোবাইল ব্যাংকিং সেবা সহজেই জনপ্রিয় করা যাবে; যাতে ব্যাংকের তেমন কোনো ব্যয় হবে না, জনবলও প্রয়োজন পড়বে না। এ কারণেই ব্যাংকগুলো নিজেদের ব্যবসা জনপ্রিয় করতে গ্রামীণফোনকে মোবাইল ব্যাংকিং সেবা পরিচালনার সুযোগ করে দেয়। এর ফলও পেয়েছে নতুন সেবায় আসা ব্যাংকগুলো।
গত জুনে মোবাইল ব্যাংকিং সেবায় এসেছে মার্কেন্টাইল ব্যাংকের মাইক্যাশ সার্ভিসেস। এ পর্যন্ত ২১ হাজার নিজস্ব এজেন্ট তৈরি করতে পেরেছে ব্যাংকটি। এর বাইরে মোবিক্যাশের ৫৫ হাজার এজেন্ট তাদের সেবা দেয়ার পাশাপাশি প্রচারণা চালাচ্ছে। এক্ষেত্রে ৫৫ হাজার মোবিক্যাশ এজেন্টের সঙ্গে চুক্তি না করে শুধু গ্রামীণফোনের সঙ্গে চুক্তি করেছে ব্যাংকটি। এ কারণেই অল্প সময়ে এক লাখের বেশি গ্রাহক তৈরি হয়েছে মাইক্যাশের।
বিষয়টি ব্যাখ্যা করে মার্কেন্টাইল ব্যাংকের মোবাইল ব্যাংকিং বিভাগের প্রধান এটিএম আতিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা মোবাইল ব্যাংকিংয়ে এসেছি অনেক পরে। আমাদের সেবা মাইক্যাশকে সহজে পরিচিত করতে মোবিক্যাশের সহায়তা নিয়েছি। মোবিক্যাশকে বিভাগীয় পরিবেশক হিসেবে বিবেচনা করে তাদের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছি। এতে বিধিমালা লঙ্ঘন হয়েছে কিনা জানি না। তবে অনেক ব্যাংক তাদের সঙ্গে আগে থেকেই কাজ করছে।’
ইউসিবির মোবাইল ব্র্যান্ড ইউক্যাশ সার্ভিসেস। এর নিজস্ব এজেন্ট রয়েছে ৪০ হাজার, যাদের প্রত্যেকের সঙ্গে ব্যাংকের চুক্তি হয়েছে। এর বাইরে মোবিক্যাশের ৫৫ হাজার এজেন্ট সেবাটি দিয়ে যাচ্ছে। যদিও ইউসিবি এজন্য শুধু গ্রামীণফোনের সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন করেছে।
ব্যাংকটির মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস বিভাগের প্রধান মীর জহির উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘সহজে গ্রাহকের কাছে পৌঁছার জন্যই আমরা গ্রামীণফোনের সহায়তা নিয়েছি। এজন্য তাদের সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। এতে বিধিমালা লঙ্ঘন হয়েছে কিনা জানি না।’
একইভাবে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক মোবাইল ব্যাংকিং, ওয়ান ব্যাংক ওকে মোবাইল ব্যাংকিং ও ইসলামী ব্যাংক এম ক্যাশ সার্ভিসেস পরিচালনা করছে গ্রামীণফোনের মোবিক্যাশ। ফলে সেবাটির ব্র্যান্ডিং হচ্ছে মোবিক্যাশ নামে।
এদিকে মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস-সংক্রান্ত চতুর্থপক্ষীয় সভায়ও এসব বিষয় নিয়ে আলোচনায় হয়েছে। ডেপুটি গভর্নর আবুল কাশেম স্বাক্ষরিত কার্যবিবরণীতে বলা হয়েছে, মোবিক্যাশের বিজ্ঞাপন দেখে গ্রাহকরা মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের সঙ্গে একে আলাদা করতে পারছে না। এটি বাংলাদেশে প্রচলিত মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসের মডেলকে চ্যালেঞ্জ করছে।
প্রসঙ্গত. এর আগে গ্রামীণফোন মোবিটাকা ব্র্যান্ডের নাম ব্যবহার সেবা চালুর অনুমোদন চায়। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের টাকার পরিবর্তে অন্য নামে সেবা চালু করে তিন ধরনের কার্যক্রম পরিচালনার অনুমোদন দেয়। গ্রামীণফোন মোবিক্যাশ নামে সেবা চালু করে তিন ধরনের সেবার অনুমোদন নিয়ে নিজেরাই হিসাব খুলে ব্যাংকিং সেবা প্রদান শুরু করে। পরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চাপে তা বন্ধ করতে বাধ্য হয়। এছাড়া সেলফোন অপারেটর রবি ‘অর্থসেবা’ নামে ব্যাংকিং কার্যক্রম চালু করলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চাপে তা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছে। আর এয়ারটেল ‘এয়ারটেল মানি’র অনুমোদন চেয়েও পায়নি।
Discussion about this post