রাজধানীর গুলশানে প্রধান কার্যালয় নির্মাণে জমি কিনছে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক। এজন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে অনুমোদন চেয়েছে ব্যাংকটি। তবে অভিযোগ উঠেছে, বাজারমূল্যের প্রায় দ্বিগুণ দামে ওই জমি কেনার প্রস্তাব বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠিয়েছে তারা। আবার ওই দরে জমি কেনার অনুমোদন মিললে ব্যাংকটির ধারণকৃত স্থাবর বা স্থায়ী সম্পদের মোট মূল্য (বুক ভ্যালু) দাঁড়াবে পরিশোধিত মূলধনের ৪৯ শতাংশ, যা আইনের লঙ্ঘন। কারণ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, কোনো ব্যাংকের ধারণকৃত সম্পত্তি পরিশোধিত মূলধনের ৩০ শতাংশের বেশি হওয়ার সুযোগ নেই।
প্রধান কার্যালয় নির্মাণের লক্ষ্যে রাজধানীর গুলশানের এসডব্লিউ (জি) ব্লকের ৬ নম্বর প্লটে প্রতি কাঠা সাড়ে ১০ কোটি টাকা মূল্যে ১৯ কাঠা ১৫ ছটাক জমি কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের পর্ষদ। এজন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন চাওয়া হয়েছে। প্রায় ২০ কোটি টাকা রেজিস্ট্রেশন খরচসহ জমিটি কিনতে ব্যাংকের ব্যয় হবে ২২৯ কোটি টাকা।
এদিকে আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিহ্যাব এবং এ খাতের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান শেলটেকের গবেষণা তথ্য বলছে, গুলশান এলাকার জমির দাম ধীরে ধীরে কমে আসছে। তারা বলছে, ২০১০ সালে গুলশানে প্রতি কাঠা জমির দাম ছিল ২ কোটি, ২০১১ সালে ৩ কোটি, ২০১২ সালে ৪ কোটি ও ২০১৩ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ৫ কোটি টাকায়। তবে বর্তমান সময়ে তা আবারো কমে ৪ কোটি টাকায় নেমেছে। এ হিসাবে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক কাঠাপ্রতি প্রায় সাড়ে ৬ কোটি টাকা বেশিতে জমি কেনার চেষ্টা করছে। তবে জমিটি মূল সড়কের পাশে হওয়ায় এর মূল্য কাঠাপ্রতি সর্বোচ্চ ৭ কোটি টাকা হবে বলে একাধিক আবাসন ব্যবসায়ী বণিক বার্তাকে জানিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে রিহ্যাবের সাধারণ সম্পাদক মো. ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, ওই এলাকায় জমির দাম ৫-৭ কোটি টাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। তবে ক্রেতা কে, তার ওপর দাম নির্ভর করে। আর্থিক প্রতিষ্ঠান হলে তারা বেশি দাম দিয়েই জমি কেনে।
২০১৩ সালের ১২ আগস্ট জারিকৃত বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, কোনো তফসিলি ব্যাংকের ধারণকৃত স্থাবর বা স্থায়ী সম্পদের মোট পরিমাণ (বুক ভ্যালু) ব্যাংকটির পরিশোধিত মূলধনের শতকরা ৩০ ভাগের অধিক হবে না। স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের নিরীক্ষা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই বছর ব্যাংকটির পরিশোধিত মূলধনের পরিমাণ ৫৭০ কোটি ২১ লাখ টাকা আর ধারণকৃত স্থাবর বা স্থায়ী (জমি ও দালালকোঠা) সম্পদের মোট মূল্য ছিল ১৬ কোটি ২৮ লাখ টাকা। তবে সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী ব্যাংকটির ধারণকৃত সম্পত্তির মূল্য দাঁড়িয়েছে ৫০ কোটি ৭৯ লাখ টাকা, যা পরিশোধিত মূলধনের ৮ দশমিক ৯১ শতাংশ।
প্রধান কার্যালয়ের জন্য জমিটি কেনার অনুমোদন মিললে ব্যাংকটির ধারণকৃত সম্পত্তির মূল্য দাঁড়াবে (৫০ কোটি ৭৯ লাখ + ২২৯ কোটি) ২৭৯ কোটি ৭৯ লাখ টাকা; যা ব্যাংকটির পরিশোধিত মূলধনের ৪৯ শতাংশ।
জানা গেছে, ব্যাংকটি ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি কাজী আকরাম উদ্দিন আহমদের মালিকানাধীন হওয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংক এখনো এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মো. মাহফুজুর রহমান গতকাল বণিক বার্তাকে বলেন, ব্যাংকটি জমি কেনার জন্য অনুমোদন চেয়েছে। তবে এখনো এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক ও গ্রুপ কোম্পানি সেক্রেটারি এএফএম নিজামুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের তো এখনো জমি কেনা হয়নি। জমি কেনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকে আবেদন করা হয়েছে। অনুমোদন পেলেই কেনা হবে। এ জমি কেনা হলে কোনো নীতিমালা লঙ্ঘন হবে কিনা, তা কেন্দ্রীয় ব্যাংক ভালো বলতে পারবে। তাদের অনুমতি ছাড়া তো জমি কেনার সুযোগ নেই।’
ব্যাংকসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যাংকের পরিচালকরা স্থাবর বা স্থায়ী সম্পত্তি কেনাকাটার মাধ্যমে সহজেই ব্যাংক থেকে অর্থ হাতিয়ে নেয়ার সুযোগ তৈরি করেন। কাগজে-কলমে বেশি দামে কেনাকাটা করে সহজেই অর্থ বের করার সুযোগ হাতছাড়া করতে চান না তারা। তাই জমি, আসবাব ইত্যাদি কেনাকাটায় বেশি আগ্রহ থাকে পরিচালকদের। এ কারণেই বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ব্যাংকের কেনাকাটার ওপর বিভিন্ন বিধি আরোপ করা আছে।
Discussion about this post