চট্টগ্রামের নারী উদ্যোক্তা লতিফা আক্তার। অগ্রণী ব্যাংক থেকে ১০ লাখ টাকা এসএমই ঋণ নিয়ে শুরু করেন বুটিক ব্যবসা। গত বছরের শেষ দিন পর্যন্তও ভালোমতোই চলছিল সবকিছু। ব্যবসা ভালো চলায় ঋণের কিস্তিও পরিশোধ করছিলেন সময়মতো। কিন্তু সব হিসাব-নিকাশ বদলে দিয়েছে চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা। জানুয়ারির পর থেকে ব্যবসায় নেমে এসেছে স্থবিরতা। ব্যবসা মন্দায় পরিশোধ করতে পারছেন না ঋণের কিস্তিও।
লতিফা আক্তারের মতোই অবস্থা দেশের প্রায় সব ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তার। হরতাল-অবরোধের কারণে ব্যবসায়িক কার্যক্রম সীমিত করে এনেছেন তারা। যা আয় হচ্ছে শ্রমিকদের মজুরি পরিশোধেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। পরিশোধ করা যাচ্ছে না ঋণের কিস্তি।
ব্যাংকের এসএমই বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, হরতাল-অবরোধে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা। রাজধানীর সঙ্গে বিভিন্ন জেলার যোগাযোগ স্বাভাবিক না থাকায় উৎপাদিত পণ্য পরিবহন সম্ভব হচ্ছে না। বাধ্য হয়ে পণ্য উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছেন তারা। এতে ব্যাংকের কিস্তি পরিশোধ অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ফলে ব্যাংকিং খাতে মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণ যেমন বেড়ে যাচ্ছে, নতুন করে ঋণ গ্রহণেও আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন অনেকে।
এসএমই খাতে ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা অর্থায়ন করেছে পূবালী ব্যাংক। গত বছরের ডিসেম্বর শেষে এ খাতে মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণ ছিল ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ। জানুয়ারি শেষে তা দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৯৩ শতাংশ। তবে মার্চ শেষে মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণ ৬ শতাংশে পৌঁছতে পারে বলে আশঙ্কা করছে ব্যাংকটি।
ফলে বেসরকারি খাতের ব্র্যাক ব্যাংক জানুয়ারিতে প্রায় চার হাজার গ্রাহকের ঋণপ্রস্তাব অনুমোদন করে। এর মধ্যে ঋণ গ্রহণ করেননি এক হাজার গ্রাহক। নতুন করে ঋণ আবেদনকারীর সংখ্যাও কমে এসেছে আশঙ্কাজনক হারে। এছাড়া ইস্টার্ন ব্যাংকের এসএমই ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ গ্রাহকের সংখ্যা বেড়েছে হাজারেরও বেশি।
ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ঋণগ্রহীতারা অনেকেই ঠিকমতো ব্যবসা করতে পারছেন না। পণ্য পরিবহনে বিঘ্ন ঘটছে। এ কারণে অনেকেই কিস্তি পরিশোধে সমস্যায় পড়ছেন। তবে আমরা নিয়মিত যোগাযোগ রেখে কিস্তি আদায়ের চেষ্টা করছি।’
জানা গেছে, ব্র্যাক ব্যাংক প্রতি মাসে ২ থেকে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত চার হাজার গ্রাহককে ঋণ দিয়ে থাকে। বর্তমানে তা অর্ধেকে নেমে এসেছে। কিস্তি পরিশোধেও ব্যর্থ হচ্ছেন অনেকে। এসএমই খাতে ইস্টার্ন ব্যাংকের গ্রাহক রয়েছে প্রায় নয় হাজার। মাসিক কিস্তির আওতায় প্রায় ৪০ শতাংশ গ্রাহক ফেব্রুয়ারিতে তা পরিশোধ করতে পারেননি। একই অবস্থা জনতা ও ইসলামী ব্যাংকেরও। সময়মতো কিস্তি আদায় করতে পারছে না ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান প্রাইম ফিন্যান্সও। জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি সময়ে রাজশাহী বিভাগে ২৫-৩১ ও চট্টগ্রামে ১০-১৫ শতাংশ ঋণের কিস্তি আদায় করতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি।
প্রাইম ফিন্যান্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আসাদ খান বলেন, রাজধানীতে সমস্যা না হলেও রাজশাহী ও চট্টগ্রামের কিছু ঋণের কিস্তি আদায় করা যাচ্ছে না।
চট্টগ্রামের আরেক নারী উদ্যোক্তা নুরুন নাহার। প্রতি মাসে ৬০ হাজার টাকার দুধ বিক্রি করতেন এ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা। তা দিয়েই ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতেন তিনি। কিন্তু চলমান পরিস্থিতিতে ২০ হাজার টাকারও দুধ বিক্রি করতে পারছেন না তিনি। পরিশোধ করা সম্ভব হচ্ছে না ঋণের কিস্তি। নিজের হাতে গড়া মুনতাসির ডেইরি ফার্মটি এখন বন্ধের উপক্রম। পরিস্থিতির শিকার বরিশালের উদ্যোক্তা বিলকিস আহমেদ লিলির প্রতিষ্ঠান ‘আঁচলেরও’।
মার্কেন্টাইল ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মণীন্দ্র কুমার নাথ বলেন, অন্য খাতের মতো এসএমই খাতটিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে ঋণ পরিশোধে সমস্যায় পড়ছেন এ খাতের উদ্যোক্তারা।
জানা গেছে, ২০১৪ সালে এসএমই খাতে মোট ১ লাখ ৯১০ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো; ২০১৩ সালের তুলনায় যা ১৮ দশমিক ২৭ শতাংশ বা ১৫ হাজার ৫৮৬ কোটি টাকা বেশি।
২০১৪ সালে এ খাতে বিতরণ করা ঋণের মধ্যে ৬৯ হাজার ১৭২ কোটি টাকা আদায় করতে পেরেছে প্রতিষ্ঠানগুলো। আদায়ের পরিমাণ আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৬৫ শতাংশ বেড়েছে। বছর শেষে এসএমই খাতে বকেয়া স্থিতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩৬ হাজার ১৪৮ কোটি টাকা, আগের বছরের চেয়ে যা ২০ শতাংশ বেশি। ২০১৩ সালে এসএমই খাতে বকেয়া ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ১৫ হাজার ৮৮৪ কোটি টাকা।
চলতি বছর এসএমই খাতে ১ লাখ ৩ হাজার ৫৯১ কোটি ৫৯ লাখ টাকা ঋণ বিতরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো। এর মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো বিতরণ করবে ৭ হাজার ৫৮ কোটি ৫০ লাখ, বিশেষায়িত ব্যাংকগুলো ৫ হাজার ৬০০ কোটি, বিদেশী ব্যাংকগুলো ৮০৩ কোটি ৬৪ লাখ ও বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলো ৮৬ হাজার ৫০৩ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। এছাড়া আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো চলতি বছর ৩ হাজার ৬২৫ কোটি ৬১ লাখ টাকার এসএমই ঋণ বিতরণের পরিকল্পনা করছে।
ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আবদুল মান্নান বলেন, যেসব ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তারা ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে পারছেন না। অন্যদের তেমন সমস্যা হচ্ছে না।
Discussion about this post