এমনিতেই সংকটে আছে বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক লিমিটেড। গত ১৫ ফেব্রুয়ারি ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আবু সাদেক মো. সোহেলের সব ধরনের ক্ষমতা কেড়ে নেয় পরিচালনা পর্ষদ। তারও আগে সাময়িক বরখাস্ত করা হয় ব্যাংকের অতিরিক্ত এমডিকে। এ অস্থিরতার মধ্যেই ব্যাংকটির খাতুনগঞ্জ শাখার এক কর্মকর্তা গ্রাহকের জমা প্রায় ৫ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন, যা এ সংকট আরো ঘনীভূত করেছে।
ব্যাংকটির খাতুনগঞ্জ শাখার কর্মকর্তা মাঈনুদ্দিন আহমেদের অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় ক্ষুব্ধ গ্রাহকরা গতকাল শাখার সামনে বিক্ষোভ করেন। পাশাপাশি তারা শাখা ব্যবস্থাপককেও অবরুদ্ধ করেন।
কমার্স ব্যাংকের চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ শাখার কয়েকজন গ্রাহক গতকাল টাকা উত্তোলন করতে গিয়ে দেখেন, তাদের হিসাবে সঞ্চিত টাকার চেয়ে কম জমা রয়েছে। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর ২০-২৫ জন গ্রাহক হিসাব যাচাই করে প্রায় ৫ কোটি টাকা কম থাকার অভিযোগ করেন। এ খবরে ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকরা ব্যাংকটির সামনে বিক্ষোভ করে শাখা ব্যবস্থাপককে অবরুদ্ধ করেন।
ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের একজন মেসার্স মামুন ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মামুনুর রশীদ বলেন, ‘সকালে ব্যাংকে এসে দেখি, আমার হিসাব থেকে ২০ লাখ ২৯ হাজার ২৫০ টাকা উধাও। শাখার কোনো কর্মকর্তাই এ বিষয়ে সঠিক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। পরে জানতে পারি, আরো অনেক গ্রাহকের টাকা নেই।’
ব্যাংকের আরেক গ্রাহক মো. কাইয়ুম উদ্দিন। তার এফডিআর থেকে ১৫ লাখ ও সঞ্চয়ী হিসাব থেকে প্রায় ৭ লাখ টাকা খোয়া গেছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। কাইয়ুম উদ্দিন বলেন, ‘এ বিষয়ে ব্যাংকটির শাখা ব্যবস্থাপকের কাছে জানতে চাইলেও তিনি কোনো সমাধান দিচ্ছেন না।’
একই অভিযোগ মেসার্স রহমান অ্যান্ড সন্সের স্বত্বাধিকারী আবদুর রহমানের। তিনি জানান, তার হিসাবে দেড় কোটি টাকা ছিল। কিন্তু গতকাল ব্যাংকে এসে দেখেন, হিসাবে ৭০ লাখ টাকা কম আছে।
জানতে চাইলে ব্যাংকটির চট্টগ্রাম খাতুনগঞ্জ শাখার ব্যবস্থাপক কাজী আবুল কাশেম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দুদিন ধরে ওই কর্মকর্তা বিনা নোটিসে ছুটিতে রয়েছেন। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে। প্রধান কার্যালয়ের নির্দেশে এরই মধ্যে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। বিষয়টি আমরা গুরুত্বসহকারে দেখছি।’
এদিকে গতকাল রাত সাড়ে ৯টার দিকে নগরীর কোতোয়ালি থানা পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেন ওই কর্মকর্তা। কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জসিম উদ্দিন বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ‘গ্রাহকদের অভিযোগের পর ব্যাংক কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় মাঈনুদ্দিন আহমেদের সঙ্গে আমরা যোগাযোগ করি। এর পর তিনি থানায় এসে আত্মসমর্পণ করেন। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ঘটনার দায় স্বীকার করেছেন মাঈনুদ্দিন। তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।
এর আগেও কমার্স ব্যাংকের রাজধানীর দুটি শাখা থেকে জালিয়াতির মাধ্যমে প্রায় ২০৫ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়া হয়েছে। এর মধ্যে ব্যাংকটির বংশাল শাখা থেকে ১৫৫ কোটি ১১ লাখ ও দিলকুশা থেকে প্রায় ৫০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়া হয়। বংশাল শাখায় জালিয়াতির ওই ঘটনা ঘটে ২০১৩ ও ২০১৪ সালে। এর মধ্যে যমুনা এগ্রো লিমিটেডের নামে হাতিয়ে নেয়া হয় ১১২ কোটি টাকা। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৫ ফেব্রুয়ারি ব্যাংকটির এমডি আবু সাদেক মো. সোহেলের সব ধরনের ক্ষমতা কেড়ে নেয় পরিচালনা পর্ষদ। সাময়িক বরখাস্ত করা হয় অতিরিক্ত এমডি ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামানকে। এমডির ক্ষমতা কেড়ে নেয়ার এ ঘটনায় পর্ষদের ব্যাখ্যা তলব ও তদন্ত শুরু করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর এসকে সুর চৌধুরী বলেন, খাতুনগঞ্জের ঘটনায় পরিদর্শন দল পাঠানো হবে। এছাড়া ব্যাংকটির এমডির ক্ষমতা কী কারণে কেড়ে নেয়া হয়েছে, পর্ষদের কাছে তার ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। বিষয়টি তদন্ত হচ্ছে, ব্যাখ্যা ও তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পরই বিস্তারিত জানা যাবে। এর পরই ব্যবস্থা নেয়া হবে।
এমডির ক্ষমতা কেড়ে নেয়ার পর থমকে গেছে ব্যাংকটির স্বাভাবিক কার্যক্রমও। সব ধরনের ঋণ প্রদান বন্ধ হয়ে গেছে, আমানত গ্রহণ না করার জন্য শাখাগুলোকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। কার্যক্রম বন্ধ হওয়ায় আটকে গেছে প্রায় ২০০ কর্মকর্তার পদোন্নতি প্রক্রিয়াও।
এদিকে গত ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ২৪৮ কোটি টাকা, যা বিতরণ করা ঋণের ২ দশমিক ৪৮ শতাংশ। একই সময় ব্যাংকটির সঞ্চিতি ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৪৬ কোটি ও মূলধন ঘাটতি ১০২ কোটি টাকা। ২০১৪ সালে ব্যাংকটি ৩৪ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা করলেও নিট মুনাফা করেছে ২ কোটি ৯০ লাখ টাকা।
Discussion about this post