একক প্রতিষ্ঠান হিসেবে সবচেয়ে বেশি ঋণের গ্রাহক বেক্সিমকো লিমিটেড। ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরভিত্তিক হিসাবে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে কোম্পানিটি ঋণ নিয়েছে ২ হাজার ৯৩৫ কোটি টাকা। বেক্সিমকোর পরই সবচেয়ে বেশি ঋণ নিয়েছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক ২ হাজার ৭৭৮ কোটি টাকা। তৃতীয় সর্বোচ্চ ঋণগ্রহীতার তালিকায় রয়েছে নিটল মোটরস। তাদের ঋণের পরিমাণ ১ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা।
রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট স্টক কোম্পানিজ অ্যান্ড ফার্মস, অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংক থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে। তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, ১ হাজার কোটি টাকার উপরে ঋণ নিয়েছে ১৬টি প্রতিষ্ঠান। এসব গ্রাহকের মধ্যে উৎপাদন খাতের প্রতিষ্ঠান যেমন আছে, একই সঙ্গে রয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানও। বড় গ্রাহকদের এসব ঋণ নিয়মিত পর্যবেক্ষণে রেখেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. মাহফুজুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, এসব ঋণের যথাযথ ব্যবহার যাতে নিশ্চিত হয়, বাংলাদেশ ব্যাংক তা তদারক করছে। পাশাপাশি কেউ যাতে খেলাপি হয়ে না পড়ে, নজরদারি করা হচ্ছে তাও। কারণ বড় ঋণ খেলাপি হলে পুরো খাতটিই ঝুঁকিতে পড়বে। তাই এসব ঋণ বিশেষ নজরদারিতে রাখা হচ্ছে।
তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত বছরের ৩১ ডিসেম্বরভিত্তিক হিসাবে ১ হাজার কোটি টাকার উপরে ঋণ নিয়েছে, এমন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রথমেই রয়েছে বেক্সিমকো গ্রুপের প্রতিষ্ঠান বেক্সিমকো লিমিটেড। সোনালী, অগ্রণী, জনতা, রূপালী, এবি, ন্যাশনাল, স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া, ফার্স্ট লিজ, আইসিবি, ফিনিক্স ফিন্যান্স থেকে ২ হাজার ৯৩৫ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানটি। এর অধীন রয়েছে সুতা, ফ্যাব্রিকস, ডেনিম, নিট গার্মেন্ট প্রতিষ্ঠান। বেক্সিমকোর কর্ণধার মূলত সালমান এফ রহমান। গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে রয়েছেন এ ব্যবসায়ী।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক। বাংলাদেশের পাশাপাশি আরো ১০টি দেশে কার্যক্রম রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। ক্ষুদ্র ঋণ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারপারসন স্যার ফজলে হাসান আবেদ। ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরভিত্তিক হিসাবে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ঋণ নিয়েছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাটি। এ ঋণ দিয়েছে অগ্রণী, ব্যাংক এশিয়া, আল-ফালাহ, বেসিক, ব্র্যাক, এবি, কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলন, ডাচ্-বাংলা, এইচএসবিসি, আইএফআইসি, যমুনা, জনতা, মিউচুয়াল ট্রাস্ট, প্রাইম, পূবালী, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন, রূপালী, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড, শাহজালাল, সাউথইস্ট, স্ট্যান্ডার্ড, ট্রাস্ট, ইউসিবিএল ও উত্তরা ব্যাংক।
তৃতীয় সর্বোচ্চ ঋণগ্রহীতা নিটল-নিলয় গ্রুপের প্রতিষ্ঠান নিটল মোটরস। ১৯৯১ সাল থেকে ভারতের টাটা গ্রুপের গাড়ি বাজারজাত করছে প্রতিষ্ঠানটি। পাশাপাশি টাটা গ্রুপের গাড়ির বডিও তৈরি করছে তারা। ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরভিত্তিক হিসাবে প্রতিষ্ঠানটিতে ১ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা অর্থায়ন করেছে ব্যাংক এশিয়া, ব্র্যাক, কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলন, দ্য সিটি, ডাচ্-বাংলা, ঢাকা, ইস্টার্ন, এক্সিম, আইএফআইসি, যমুনা, মার্কেন্টাইল, এনসিসি, এনআরবি কমার্শিয়াল, ওয়ান, প্রাইম, পূবালী, শাহজালাল, সোস্যাল ইসলামী, স্ট্যান্ডার্ড, স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া ও ইউসিবিএল। গ্রুপটির প্রতিষ্ঠাতা আবদুল মাতলুব আহমাদ। আসন্ন এফবিসিসিআই নির্বাচনে সভাপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন এ ব্যবসায়ী।
নিটল মোটরসের পরই সবচেয়ে বেশি ঋণ নিয়েছে চট্টগ্রামভিত্তিক শিল্প গ্রুপ এস আলমের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান এস আলম সুপার এডিবল অয়েল। গত বছরের ডিসেম্বরভিত্তিক হিসাবে কৃষি, এক্সিম, ইসলামী, জনতা, ন্যাশনাল ও সাউথইস্ট ব্যাংক থেকে প্রতিষ্ঠানটি ঋণ নিয়েছে ১ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা। এস আলম সুপার এডিবল অয়েল মূলত ভোজ্যতেল পরিশোধন ও বাজারজাত করে থাকে। দেশের ভোজ্যতেলের বাজারের বড় অংশ প্রতিষ্ঠানটির নিয়ন্ত্রণে। এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে রয়েছেন মোহাম্মদ সাইফুল আলম।
ঋণের পরিমাণের দিক দিয়ে পঞ্চম স্থানে রয়েছে সেলফোন অপারেটর প্যাসিফিক বাংলাদেশ লিমিটেড (সিটিসেল)। এবি, ব্যাংক এশিয়া, কমার্স, ব্র্যাক, কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলন, দ্য সিটি, ইস্টার্ন, এক্সিম, আইপিডিসি, আইএফআইসি, ন্যাশনাল, ট্রাস্ট, ডাচ্-বাংলা ব্যাংক থেকে অপারেটরটির গৃহীত ঋণ ১ হাজার ৩২৭ কোটি টাকা। সিটিসেল হচ্ছে দেশের প্রথম সেলফোন নেটওয়ার্ক সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান।
আব্দুল মোনেম গ্রুপের প্রতিষ্ঠান আব্দুল মোনেম লিমিটেড। মূলত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরভিত্তিক হিসাবে প্রতিষ্ঠানটির ঋণের পরিমাণ ১ হাজার ২৭৪ কোটি টাকা। এ ঋণ দিয়েছে আল-আরাফাহ, ব্যাংক এশিয়া, ডাচ্-বাংলা, বাংলাদেশ ফিন্যান্স, ঢাকা এক্সিম, আইএফআইসি, যমুনা, লংকাবাংলা, মধুমতি, মিউচুয়াল ট্রাস্ট, ন্যাশনাল হাউজিং, এনআরবি কমার্শিয়াল, ওয়ান, প্রাইম, পূবালী, সোস্যাল ইসলামী, সোনালী, স্ট্যান্ডার্ড, ট্রাস্ট, ইউসিবিএল ও উত্তরা ফিন্যান্স। গ্রুপটির চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল মোনেম।
দেশের প্রথম সারির শিল্প গ্রুপগুলোর অন্যতম আবুল খায়ের। ১৯৫৩ সালে প্রতিষ্ঠিত আবুল খায়ের গ্রুপের ব্যবসা রয়েছে সিমেন্ট, রড, ভোগ্যপণ্য, সিরামিক, শিপিং, টোব্যাকো ও রেডিমিক্সেও। গত বছরের ৩১ ডিসেম্বরভিত্তিক হিসাবে গ্রুপের প্রতিষ্ঠান শাহ সিমেন্ট ঋণ নিয়েছে ১ হাজার ২১৩ কোটি টাকা। গ্রুপের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে রয়েছেন আবুল কাশেম।
ঋণ গ্রহণে শাহ সিমেন্টের পরই রয়েছে জাহাজ নির্মাণ খাতের প্রতিষ্ঠান আনন্দ শিপইয়ার্ড। আলোচ্য সময়ে ইসলামী, মার্কেন্টাইল, জনতা, এবি ব্যাংকসহ আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইডিএলসি, ফারইস্ট, প্রিমিয়ার লিজিং, প্রাইম ফিন্যান্স, ন্যাশনাল হাউজিং, হজ ফিন্যান্স ও বিডি ফিন্যান্স থেকে ১ হাজার ২০৩ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এর কর্ণধার আবদুল্লাহেল বারী।
চট্টগ্রামভিত্তিক কবির গ্রুপের প্রতিষ্ঠান কেএসআরএম স্টিল প্লান্ট। জাহাজ ভাঙা, অক্সিজেন, সিমেন্টসহ অন্যান্য ব্যবসাও রয়েছে গ্রুপটির। এর মধ্যে কেএসআরএম স্টিলের নামে নেয়া ঋণের পরিমাণ ১ হাজার ১৬২ কোটি টাকা। একই এলাকার এস আলম গ্রুপের প্রতিষ্ঠান এস আলম রিফাইন্ড সুগার ইন্ডাস্ট্রিজের ঋণ ১ হাজার ৯২ কোটি ও এস আলম ভেজিটেবলের ১ হাজার ৬৭ কোটি টাকা।
চট্টগ্রামভিত্তিক আরেক শিল্প গ্রুপ এসএ গ্রুপের প্রতিষ্ঠান এসএ অয়েলের ঋণের পরিমাণ ১ হাজার ৩৪ কোটি টাকা। ভোগ্যপণ্যের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের ব্যবসা রয়েছে গ্রুপটির। মুসকান, গোয়ালিনী, আপ্যায়ন নামে পণ্য বাজারজাত করে গ্রুপটি। এর কর্ণধার সাহাবুদ্দিন আলম। তিনি মার্কেন্টাইল ব্যাংকেরও পরিচালক।
২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরভিত্তিক হিসাবে নোমান গ্রুপের প্রতিষ্ঠান জাবের অ্যান্ড জুবায়ের ফ্যাব্রিকসের ঋণের পরিমাণ ১ হাজার ২৭ কোটি টাকা। গ্রুপটির চেয়ারম্যান হিসেবে রয়েছেন নুরুল ইসলাম।
আবুল খায়ের গ্রুপের আরেক প্রতিষ্ঠান আবুল খায়ের টোব্যাকোর ঋণ ১ হাজার ১৯ কোটি। নুরজাহান গ্রুপের প্রতিষ্ঠান মারিন ভেজিটেবলের ঋণের পরিমাণ ১ হাজার ১৮ কোটি টাকা। জাসমির, তাসমিন, সুফি অ্যান্ড ব্রাদার্স, জাইমাসহ বিভিন্ন নামে পণ্য বাজারজাত করে ব্যবসায়ী গ্রুপটি। গ্রুপটির কর্ণধার জহির উদ্দিন রতন। খাদ্যের গ্লোবাল শপ সিপি বাংলাদেশের ঋণের পরিমাণ ১ হাজার ৩ কোটি টাকা।
ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, কোনো ব্যাংক একটি প্রতিষ্ঠানকে কী পরিমাণ ঋণ দেবে, তার সীমা বেঁধে দেয়া আছে। বড় গ্রুপগুলো তাই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ নিয়ে থাকে। একটি প্রতিষ্ঠানকে একাধিক ব্যাংক মিলেও অর্থায়ন করে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমেদ চৌধুরী বলেন, অনেক প্রতিষ্ঠান বড় অঙ্কের ঋণ নিয়ে পরিশোধ করছে না। বিশেষ করে চট্টগ্রামে বড় ধরনের ধাক্কা খেয়ে ব্যাংকগুলো সতর্ক হয়ে গেছে। আগে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দেয়া অর্থ এখন সিন্ডিকেট করে আদায়ের চেষ্টা করছে। একটি প্রতিষ্ঠান কী পরিমাণ ঋণ নিতে পারবে, তা নির্ধারিত না থাকায় অনেক ব্যাংক মিলে অর্থায়ন করেছে। এখন গ্রহীতা কী পরিমাণ ঋণ পাবে, তা নির্ধারণের পরিকল্পনা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

Discussion about this post