সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব মডেলে গড়া বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক। এতে রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মালিকানা ৫১ শতাংশ। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অংশীদারিত্ব ৪৯ শতাংশ। কিন্তু নানা অনিয়ম, লুটপাট আর অব্যবস্থাপনায় ধ্বংসোন্মুখ ব্যাংকটি। এর পেছনে সরকারি ও বেসরকারি পরিচালকদের দ্বন্দ্ব ও ক্ষমতার অপব্যবহারই দায়ী বলে মনে করছেন ব্যাংকটির কর্মকর্তারা। এরই মধ্যে গতকাল ব্যাংকটির আশুলিয়া কাঠগড়া শাখায় ঘটল রোমহর্ষক ডাকাতির ঘটনা।
গত ১৫ ফেব্রুয়ারি ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) সব ধরনের ক্ষমতা কেড়ে নেয়া হয়। তারও আগে সাময়িক বরখাস্ত করা হয় অতিরিক্ত এমডি ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামানকে। ব্যাংকটির ডিএমডি কাজী আনিসুল কবিরকে চলতি দায়িত্ব দেয়া হলেও ক্ষমতা দেয়া হয়নি। চেয়ারম্যান ইউসুফ আলী হাওলাদারের একক সিদ্ধান্তেই পরিচালিত হচ্ছে ব্যাংকটি। ফলে ব্যাংকটির দৈনন্দিন কার্যক্রমেও ভাটা পড়েছে।
ব্যাংকটির কর্মকর্তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে গতকাল বণিক বার্তাকে বলেন, সরকারি পরিচালকরা চাইছেন ব্যাংকটিকে পুরোপুরি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে। এ চেষ্টায় পিছিয়ে নেই বেসরকারি পরিচালকরাও। এ সুযোগে আবার অনেকে বড় অঙ্কের অর্থ বের করে নিচ্ছেন ব্যাংক থেকে। এসব অপকর্মের কারণে প্রায়ই আলোচনায় আসছে কমার্স ব্যাংক।
তারা বলেন, গত ১৫ বছরে ১৯ জন এমডি এসেছেন ব্যাংকটিতে। কিন্তু কেউ ব্যাংকটিকে ভালো করার চেষ্টা করেননি। সবাই নিজেদের পছন্দের কর্মকর্তা নিয়োগ দিয়ে গেছেন। তারাই বিভিন্ন অনিয়ম করে ব্যাংকটিকে সংকটে ফেলেছেন।
এসব বিষয়ে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান ইউসুফ আলী হাওলাদারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘আশুলিয়ার ঘটনায় ব্যস্ত আছি। এখন কোনো কথা বলা যাবে না’।
জানা গেছে, গত ৩০ মার্চ কমার্স ব্যাংকের খাতুনগঞ্জ শাখার কর্মকর্তা মাঈনুদ্দিন আহমেদ গ্রাহকের জমা প্রায় ৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন। এ নিয়ে ক্ষতিগ্রস্তরা ব্যাংকটির সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। এ সময় শাখা ব্যবস্থাপককেও অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। এর আগে গত বছর ব্যাংকটির বংশাল শাখা থেকে জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য মো. শওকত চৌধুরীর মালিকানাধীন যমুনা এগ্রো কেমিক্যাল ১১২ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়। এ ঘটনায় গত ১৫ ফেব্রুয়ারি ব্যাংকটির এমডি আবু সাদেক মো. সোহেলের সব ধরনের ক্ষমতা কেড়ে নেয় পরিচালনা পর্ষদ। একই ঘটনায় ব্যাংকটির অতিরিক্ত এমডি ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামানও সাময়িক বরখাস্ত হন। ব্যাংকটির এমডি হিসেবে সাময়িক দায়িত্ব দেয়া হয় ডিএমডি কাজী আনিসুল কবিরকে। তবে তাকে কোনো ক্ষমতা দেয়া হয়নি। এতে পুরো ব্যাংকটিতে অচলাবস্থা নেমে এসেছে।
জানা গেছে, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের দুটি শাখা থেকে জালিয়াতির মাধ্যমে প্রায় ২০৫ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়া হয়েছে। এর মধ্যে ব্যাংকের বংশাল শাখা থেকে ১৫৫ কোটি ১১ লাখ এবং দিলকুশা শাখা থেকে প্রায় ৫০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়া হয়। রাজধানীর বংশাল শাখায় ওই জালিয়াতির ঘটনা ঘটে ২০১৩ ও ২০১৪ সালে। ব্যাংক কর্মকর্তাদের যোগসাজশে সাতটি প্রতিষ্ঠান ব্যাংকিং রীতিনীতি লঙ্ঘন করে তুলে নিয়েছে এসব টাকা। এর মধ্যে যমুনা এগ্রো নামের একটি প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ নেয়া হয়েছে ১১২ কোটি টাকা। বংশাল শাখার সাবেক ব্যবস্থাপকসহ কিছু কর্মকর্তা বেনামি প্রতিষ্ঠানের নামেও টাকা হাতিয়ে নেয়ার ঘটনা ধরা পড়েছে। সাবেক শাখা ব্যবস্থাপকের স্ত্রীর নামে বেনামি হিসাব খুলে কোটি কোটি টাকা অন্য হিসাবে স্থানান্তর করার প্রমাণ মিলেছে। এভাবেই ব্যাংকটি থেকে কর্মকর্তাদের সহায়তায় অর্থ বের হয়েছে।
ব্যাংকটির কর্মকর্তারা বলছেন, এমডি না থাকায় চেয়ারম্যানই এখন সে দায়িত্ব পালন করছেন। ডিএমডির এখতিয়ারের বাইরে সব বিষয় চেয়ারম্যান দেখাশোনা করছেন। পরে তা পর্ষদ সভায় অনুমোদন করিয়ে নেয়া হচ্ছে। চেয়ারম্যানই এখন ব্যাংকটির এমডি। এ নিয়ে বেসরকারি পরিচালকরা সবাই ক্ষুব্ধ, যা ছড়িয়ে পড়েছে ব্যাংকটির সব শ্রেণীর কর্মকর্তার মধ্যে।
জানা গেছে, গত ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ২৪৮ কোটি টাকা, যা বিতরণ করা ঋণের ২ দশমিক ৪৮ শতাংশ। একই সময়ে ব্যাংকটির সঞ্চিতি ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৪৬ কোটি টাকা আর মূলধন ঘাটতি ১০২ কোটি টাকা। ২০১৪ সালে ব্যাংকটি ৩৪ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা করলেও নিট মুনাফা হয়েছে ২ কোটি ৯০ লাখ টাকা।
ব্যাংক সূত্রগুলো বলছে, একটি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে অবলুপ্ত বাংলাদেশ কমার্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড ১৯৮৬ সালের ২৭ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ১৯৯২ সালের এপ্রিল পর্যন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রাখে। তারল্য সংকটে পড়ে কার্যক্রম পরিচালনায় ব্যর্থ হলে ১৯৯২ সালের একই মাসে বাংলাদেশ ব্যাংক এর কার্যক্রম স্থগিত ঘোষণা করে। এতে আমানতকারী ও ব্যাংকের কর্মীরা বিপাকে পড়েন ও আন্দোলনে নামেন। পরে বাংলাদেশ সরকার বাংলাদেশ কমার্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডকে (বিসিআইএল) বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। সাবেক বিসিআইএলের ২৪টি শাখাকে পুনর্গঠনপূর্বক বিসিবিএলের পূর্ণাঙ্গ শাখা হিসেবে চালু করা হয়। একটি তফসিলি বাণিজ্যিক ব্যাংক হিসেবে বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক লিমিটেড ১৯৯৯ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর যাত্রা করে। ২০০৪ সাল থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের তালিকায় প্রবলেম ব্যাংক হিসেবে চিহ্নিত হয় ব্যাংকটি।
২০১৩ সালের আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী, ব্যাংকটির ৩৩ দশমিক ৯৪ শতাংশ শেয়ারের মালিকানা রাষ্ট্রের। এছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, জনতা ও অগ্রণী ব্যাংকের শেয়ার ১১ দশমিক ৩২ শতাংশ। সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ৫ দশমিক ১৫ শতাংশ। সবমিলিয়ে সরকারি খাতের শেয়ার ৫১ দশমিক ৪১ ও বেসরকারি খাতের ৪৯ দশমিক ৫৯ শতাংশ।

Discussion about this post