সানমুন গ্রুপের কর্ণধার মিজানুর রহমান মিজান ও তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা ঋণ প্রদানে অনিয়মের ঘটনায় ফেঁসে যাচ্ছেন অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সৈয়দ আবদুল হামিদ। এ অনিয়মের সঙ্গে এমডির জড়িত থাকার তথ্য তুলে ধরে সম্প্রতি ব্যাংকটির চেয়ারম্যানকে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
চিঠিতে পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের সমন্বয়ে কমিটি গঠন করে বিষয়টি খতিয়ে দেখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিবের কাছে পাঠানো আরেক চিঠিতে এ বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে। এতে অনিয়মের সঙ্গে ব্যাংকটির প্রিন্সিপাল শাখার সাবেক ব্যবস্থাপক মিজানুর রহমান খানের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টিও উঠে এসেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের চিঠি পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান জায়েদ বখ্ত। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে অডিট কমিটিকে তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। তদন্ত শেষ হলে প্রকৃত অবস্থা বেরিয়ে আসবে। এর পরই ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
উভয় চিঠিতে বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, অগ্রণী ব্যাংক এমডির জ্ঞাতসারে এবং তার প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিতে ব্যাংকটির প্রিন্সিপাল শাখার একটি চক্র পরিচালনা পর্ষদকে মিথ্যা তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করে মিজানুর রহমান মিজান এবং তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে ঋণ অনুমোদন ও বিতরণ করে আমানতকারীদের প্রায় ৩০০ কোটি টাকা ঝুঁকিগ্রস্ত করেছে; সার্বিকভাবে যার দায়ভার ব্যাংকের এমডির ওপর বর্তায়।
চিঠি থেকে জানা যায়, যে ভবন নির্মাণের জন্য মুন বাংলাদেশ লিমিটেডকে ঋণ দেয়া হয়, তার নকশা ১৯৯৮ সালে অনুমোদন হলেও ২০০২ সালে তা বাতিল হয়ে যায়। নকশা বাতিলের ১০ বছর পর ২০১২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি প্রতিষ্ঠানটিকে ঋণ দেয়ার প্রস্তাবটি পর্ষদের কাছে উপস্থাপন করা হয়; যার সঙ্গে ব্যাংকটির এমডি সরাসরি জড়িত।
ব্যাংকের ২০১২ সালের ১ জানুয়ারির পরিদর্শন প্রতিবেদন অনুযায়ী, গ্রাহক কর্তৃক সরবরাহকৃত নকশা অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট প্রকল্পে সাতটি ভবনবিশিষ্ট কমপ্লেক্সে পর পর তিনটি ভবন নির্মাণ করার কথা। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের সরেজমিন তদন্তে বেরিয়ে আসে, নির্মাণাধীন একটি ভবন ছাড়া অন্য কোনো ভবন, ভবন নির্মাণের চিহ্ন বা গ্রাহকের মালিকানাধীন কোনো ফাঁকা জায়গা পাওয়া যায়নি। কেন তিনটি ভবনের বিপরীতে ঋণ ছাড় করা হয়েছে, তার কোনো সদুত্তর সংশ্লিষ্ট শাখার কর্মকর্তারা দিতে পারেননি। নির্মাণাধীন ভবন-সংলগ্ন উত্তর পাশে গ্রাহকের মালিকানাধীন অন্য ভবন রাজিয়া টাওয়ার সরকারি জায়গায় নির্মিত। সরকারি জমিতে প্রকল্প নির্মাণের জন্য গ্রাহকের ঋণ চাহিদার বিষয়টি পরিচালনা পর্ষদের কাছে গোপন করা হয়। আর এতে এমডি মূল ভূমিকা রেখেছেন।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, রাজধানীর কল্যাণপুরে নির্মাণাধীন সানমুন স্টার প্লাজা প্রায় ২০ ফুট সড়কের পাশে অবস্থিত। এর কোনো বাণিজ্যিক সম্ভাবনা নেই। কিন্তু ঋণের জন্য পরিচালনা পর্ষদের কাছে দেয়া প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল, প্রকল্পটি ২৫০ ফুট ঢাকা-আরিচা সড়কের পাশে অবস্থিত। এভাবে প্রকল্পের বাণিজ্যিক সম্ভাবনার মিথ্যা তথ্য দিয়ে এমডি গুরুতর অপরাধ করেছেন।
এছাড়া কল্যাণপুরে গ্রুপটির ২০ তলা ভবন নির্মাণের জন্য দাখিলকৃত ঋণ-সংক্রান্ত নথিতে মূল দলিল পাওয়া যায়নি। একইভাবে সার্টিফায়েড কপিও পাওয়া যায়নি। ঋণ প্রদানের আগে নথিপত্র যাচাই না করেই প্রাক্কলিত ব্যয় ২০২ কোটি টাকা বিবেচনায় ঋণ ও ইকুইটি ৫০: ৫০ অনুপাতে ১০০ কোটি টাকার সাধারণ গৃহ নির্মাণ ঋণ প্রদানের জন্য পর্ষদে উপস্থাপন করা হয়; যা এমডির সরাসরি সহায়তায় বাস্তবায়ন হয়।
বলা হয়, নিয়ম অনুযায়ী নির্মাণকাজের অগ্রগতির ভিত্তিতে পরবর্তী কিস্তি ছাড় করার আগে দুজন কর্মকর্তা যৌথভাবে কাজের অগ্রগতি যাচাই করবেন। কিন্তু এ ঋণের ক্ষেত্রে এসব শর্ত মানা হয়নি। একই সঙ্গে দুই কিস্তি ও কয়েক দিনের ব্যবধানে একাধিক কিস্তি ছাড় করা হয়। এমডির সহায়ক ভূমিকার ফলেই এ অনিয়ম সম্ভব হয়েছে।
মঞ্জুরিপত্রের বিতরণ পদ্ধতির শর্ত অনুযায়ী, প্রাক্কলিত ব্যয়ের বেশি অর্থ প্রয়োজন হলে গ্রাহককে নিজ উত্স থেকে ব্যয় করতে হবে এবং একই প্রকল্পের জন্য নতুন ঋণের আবেদন করা যাবে না। এর পরও গ্রাহকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রাক্কলিত ব্যয় ২০২ কোটি টাকা থেকে ২৭০ কোটি টাকায় বৃদ্ধি করে ঋণ-ইকুইটি অনুপাত ৩৭: ৬৩ থেকে ৪০: ৬০-এ পরিবর্তনের জন্য পর্ষদে উপস্থাপন করা হয়। একই সঙ্গে আরো ৩৩ কোটি টাকা ঋণের অনুমোদন করা হয়। ব্যাংকটির এমডি সরাসরি এ প্রক্রিয়ায় জড়িত হয়ে গ্রাহককে অতিরিক্ত অর্থ ছাড় করিয়ে নিতে সহায়তা করেছেন।
এসব অনিয়মের দায়ে ব্যাংকটির প্রিন্সিপাল শাখার সাবেক ব্যবস্থাপক ও বর্তমান উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) মিজানুর রহমান খানসহ প্রিন্সিপাল শাখার নয় কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য নির্দেশ দেয়া হলেও এমডি তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেননি। উল্টো গত ২৬ জানুয়ারি তাদের অনিয়মের দায় থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়। এ কর্মকর্তারা হলেন— ডিজিএম আখতারুল আলম, আমিরুল ইসলাম ও জহর লাল রায়, এজিএম শফিউল্লাহ, এসপিও রফিকুল ইসলাম, মুজিবুর রহমান ও ফজলুল হক এবং সিনিয়র অফিসার অনির্বাণ সরকার। এছাড়া শাস্তির পরিবর্তে পদোন্নতি পেয়ে ডিএমডি হয়েছেন মিজানুর রহমান খান। এতেই প্রমাণ হয়, এমডির প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিতেই এ ঋণ অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে এবং অনিয়মের দায়ভার এড়াতেই মূলত তিনি বিভিন্ন কর্মকর্তাকে গুরুতর অপরাধের জন্য সতর্ক করেন।
চিঠিতে বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, সানমুন গ্রুপের প্রায় ৩০০ কোটি টাকা ঋণ ছাড়াও সংশ্লিষ্ট আরেক প্রতিষ্ঠান মুন ইন্টারন্যাশনাল গার্মেন্টস অ্যান্ড কম্পোজিট টেক্সটাইলের আরো ১৬১ কোটি টাকার ঋণ অনুমোদনের বিষয়টি চূড়ান্ত পর্যায়ে ছিল। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশের পর এমডি তা পর্ষদে উপস্থাপনে সক্ষম হননি।
অগ্রণী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ এসব অনিয়মে দায়ীদের শাস্তির জন্য একজন উপব্যবস্থাপনা পরিচালকের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠন করেছে। কিন্তু অনিয়মের সঙ্গে এমডির সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া হলেও ব্যাংক এ বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা না দিয়ে পাশ কাটানোর চেষ্টা করেছে, যা অনাকাঙ্ক্ষিত।
অগ্রণী ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক খন্দকার বজলুল হকের সময় এ ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ঋণ প্রস্তাব পর্ষদে এসেছে ক্রেডিট কমিটির অনুমোদনের পরই। যদি এমডি ক্রেডিট কমিটিকে পাশ কাটিয়ে পর্ষদে নিয়ে আসেন, তাহলে দায়ভার তার। তবে এসব ঋণের পর্যাপ্ত জামানত রয়েছে। ব্যাংকের কোনো ক্ষতি হবে না এতে। আর মিজানুর রহমান খানকে ডিএমডি করার ক্ষেত্রে আমাদের কোনো মতামত নেয়া হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিনিধির সমন্বয়ে গঠিত কমিটিই তাকে ডিএমডি করেছে।’
Discussion about this post