বালি ফেলে ভরাট করা হচ্ছে ন্যাশনাল ব্যাংকের নির্মাণাধীন টুইন টাওয়ারের বেজমেন্ট। ধস থেকে আশপাশের রাস্তা ও স্থাপনা রক্ষায় বেজমেন্টের বড় অংশ এরই মধ্যে ভরাট করা হয়েছে। চাপা পড়েছে ভিত্তিসহ ইস্পাত নির্মিত বেজমেন্টের তিনতলা পর্যন্ত। এ অবস্থায় ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয়ের জন্য প্রস্তাবিত টুইন টাওয়ার নির্মাণ অনিশ্চয়তায় পড়ল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়াই নির্মাণ হচ্ছে ন্যাশনাল ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের জন্য ওই ভবন। কারওয়ান বাজার মোড়ে নির্মাণাধীন ভবনের গর্তে গত বুধবার হঠাৎ ধসে পড়ে সুন্দরবন হোটেলসংলগ্ন সড়কের অংশবিশেষ। এতে ঝুঁকিতে পড়ে হোটেল ভবনটি। গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় আবারো ধসের ঘটনা ঘটে। ওই দিনই ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শামসুল হুদা খানকে তলব করে অনুমোদন ছাড়াই ভবন নির্মাণের বিষয়ে ব্যাখ্যা চায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
গতকাল সরেজমিন দেখা যায়, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়কের সোনারগাঁও হোটেলের উল্টো দিকের অংশের বেজমেন্টও ভরাট করা হচ্ছে। ভরাটকাজ চলছে সুন্দরবন হোটেলের অংশেও। এছাড়া পান্থপথ সড়কের অংশেও বালি ফেলার কাজ চলছে। বালি ফেলে ভরাট করা হচ্ছে টুইন টাওয়ারের জন্য নির্মাণাধীন ভিত্তি অংশও। এছাড়া বেজমেন্টের তিনতলার তিন পাশেও বালি ফেলা হচ্ছে। পাশেই নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের প্রকল্প কার্যালয় ধসে পড়ায় সেখানেও বালি ফেলা হবে বলে জানা গেছে।
বালিতে চাপা পড়ছে নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের নির্মাণসামগ্রীও। পুরো ইস্পাতের কাঠামোটিই ঢেকে দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
এদিকে ধসের ঘটনায় ইমারত নির্মাণ আইনে ন্যাশনাল ব্যাংক ও নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে গত বৃহস্পতিবার কলাবাগান থানায় মামলা করেছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। একই দিন গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ও সংবাদ সম্মেলন করে এ ঘটনায় ভবন মালিক ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেড ও নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করে। মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন আশপাশের ক্ষতিগ্রস্ত ভবন মালিকরাও। এ অবস্থায় পুনরায় নির্মাণ শুরুর বিষয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।
এ বিষয়ে ন্যাশনাল ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শামসুল হুদা খান বণিক বার্তাকে বলেন, নিরাপত্তা বিবেচনায় আমরা নিজেরাই মাটি ভরাট করে দিচ্ছি। এটা টেকনিক্যাল বিষয়। ভবন নির্মাণ হবে কিনা, এটা এখনই বলা যাচ্ছে না।
টুইন টাওয়ারের সহনির্মাতা প্রতিষ্ঠান এমএস কনস্ট্রাকশনের কর্ণধার মো. সালাহউদ্দিন বলেন, বেজমেন্টের তিনতলার বড় অংশই নির্মাণ শেষ হয়েছে। পাশের দেয়াল ধসে পড়ায় কাজ বন্ধ হয়ে যায়। মূল সড়ক ও আশপাশের নিরাপত্তা বিবেচনায় নিয়ে ভরাট করা হচ্ছে। ভবন নির্মাণ ও ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে পরে আলোচনা হবে।
এর আগে বালি ভরাটকাজ পরিদর্শনে এসে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আনিসুল হকও বলেন, আগে নিরাপত্তা। মূল সড়ক রক্ষা করতে হবে। ভবন নির্মাণ হবে কিনা, তা আমাদের ভাবনায় নেই। আমাদের ভাবনায় এখন নিরাপত্তার বিষয়টি।
কার্যত তিনতলা পর্যন্ত ৭০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হওয়া বেজমেন্ট ঢাকা পড়ায় বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে পারে ন্যাশনাল ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ও নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান। নতুন করে ভবনটি নির্মাণ করতে চাইলে প্রয়োজন হবে বিশেষ প্রযুক্তির। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বেজমেন্টের ইস্পাত কাঠামো সরিয়ে নতুন করে ভবন নির্মাণের প্রযুক্তি আগে ব্যবহার হয়নি বাংলাদেশে।
জানা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়াই প্রধান কার্যালয়ের জন্য এ টুইন টাওয়ার নির্মাণ করছিল ন্যাশনাল ব্যাংক। এর নির্মাণ ব্যয় ধরা হয় প্রায় ১৯৫ কোটি টাকা। এজন্য চুক্তি অনুযায়ী দক্ষিণ কোরীয় নির্মাতা প্রতিষ্ঠান হেরিম আর্কিটেক্ট অ্যান্ড প্ল্যানার্স কোম্পানিকে ২৫ কোটি টাকা পরিশোধও করে ব্যাংকটি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন নিয়েই বিদেশে পাঠানো হয় এ অর্থ।
সূত্রমতে, রাজধানীর কারওয়ান বাজারের সার্ক ফোয়ারার পাশে সুন্দরবন হোটেলসংলগ্ন এলাকায় ১৯৯৪ সালে দুই দফায় ও ১৯৯৯ সালে এক দফায় মোট ৬৫ দশমিক ৬৬ শতাংশ জমি কেনে ন্যাশনাল ব্যাংক। একই দাগে জমি কেনে প্রগতি ইন্স্যুরেন্সও। এতে জমির ব্যবহার আটকে থাকে। পরে ২০১১ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বণ্টননামা দলিল সূত্রে ন্যাশনাল ব্যাংক ৫৯ দশমিক ৯২ কাঠা জমি পায়। এর আগেই ২০০৯ সালের ২৮ ডিসেম্বর ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ ওই জমিতে ২০ তলাবিশিষ্ট প্রধান কার্যালয় নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয়। এ লক্ষ্যে ২০১০ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি হেরিম আর্কিটেক্ট অ্যান্ড প্ল্যানার্সের সঙ্গে চুক্তি করে ব্যাংকটি। তবে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) ১৫০ ফুটের বেশি উচ্চতার ভবন নির্মাণের অনুমতি না দেয়ায় ১৫ তলা নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়। পরে বেবিচকের নিয়মানুযায়ী প্রধান কার্যালয়ের জন্য ১২ তলা ভবন ও ১২ তলা আবাসিক হোটেল নির্মাণের অনুমতি দেয় রাজউক।
ব্যাংক কোম্পানি আইনে ব্যাংকের হোটেল ব্যবসার সুযোগ না থাকলেও ২০১০ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের অফসাইট সুপারভিশন বিভাগ ন্যাশনাল ব্যাংককে চুক্তি অনুযায়ী হেরিম আর্কিটেক্ট অ্যান্ড প্ল্যানার্স কোম্পানিকে অর্থ প্রেরণের অনুমতি দেয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাংকটি প্রায় ২৫ কোটি টাকা পরিশোধ করে। কী কাজের জন্য এ অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক তা জানতে চেয়ে চিঠি দিলেও উত্তর মেলেনি।
ব্যাংক কোম্পানি আইনের ৭(১) ধারা অনুযায়ী, হোটেল ব্যবসার সুযোগ না থাকায় ব্যাংকটির কাছে ২০১৩ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি চিঠি দেয়া হয়।
তাতে প্রধান কার্যালয়ের জন্য দুটি ভবন আবশ্যক হবে না বিধায় আবাসিক হোটেলের জন্য নির্ধারিত জমি বিক্রির পরামর্শ দেয়া হয়। তবে এখনো তা পরিপালন করেনি ব্যাংকটি।
পরে গত বছরের ১৭ জুলাই ব্যাংকটিকে নির্দেশনা দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তাতে বলা হয়, প্রধান কার্যালয়ের জন্য দুটি ভবনের প্রয়োজন পড়বে না। তাই প্রধান কার্যালয়ের জন্য কী পরিমাণ জমি প্রয়োজন, তা নির্ধারণের পর নতুন করে নকশা প্রণয়ন করতে বলা হয়। কোরীয় কোম্পানিকে কোন খাতে অর্থ পাঠানো হয়েছে, জানতে চাওয়া হয় তাও। পাশাপাশি প্রধান কার্যালয়ের নতুন ভবন নির্মাণের জন্য স্পেস নির্ধারণ ও নকশা সংশোধনের পর গণপূর্ত বিভাগের মাধ্যমে ব্যয় নির্ধারণ করে নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তির নির্দেশ দেয়া হয়। তবে ব্যাংকটি এসব নির্দেশনা পালন না করেই ভবন নির্মাণের কাজ চালিয়ে যাচ্ছিল।
Discussion about this post