দুবাইভিত্তিক কোম্পানি মোহসেন আল ব্রাইকি জেনারেল ট্রেডিং। কোম্পানির ৪৯ শতাংশ শেয়ারের মালিক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক বাংলাদেশী নাগরিক আবুল আহসান চৌধুরী। ওই প্রতিষ্ঠান থেকে পণ্য আমদানির নামে তিন ব্যাংকের মাধ্যমে ঋণপত্র খোলে পুরান ঢাকার মিটফোর্ড এলাকার রাসায়নিক পণ্য ও খাদ্য আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান মেসার্স ফয়েজ উদ্দিন অ্যান্ড কোম্পানি। কিন্তু পণ্য আসেনি। অথচ পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে প্রায় ২১৬ কোটি টাকা। পণ্য আমদানির নামে দুবাইয়ে অর্থ পাচারের এ প্রমাণ মিলেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশেষ পরিদর্শনে।
মেসার্স ফয়েজ উদ্দিন অ্যান্ড কোম্পানির অঙ্গপ্রতিষ্ঠান ফয়েজ উদ্দিন ফুড অ্যান্ড বেভারেজ ও তানভী ইন্টারন্যাশনাল। এর কর্ণধার হিসেবে নাম রয়েছে রফিক উদ্দিন স্বপন, নাসির উদ্দিন বাবুল, ফিরোজ উদ্দিন খোকন ও নাফিজ উদ্দিন তুহিনের। তবে রফিক উদ্দিন স্বপনই মূলত এসব প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শন অনুযায়ী, সোস্যাল ইসলামী ব্যাংকের বেগম রোকেয়া সরণি শাখায় ফয়েজ উদ্দিন অ্যান্ড কোম্পানির নামে ২০১১ সালের ৭ জুন হিসাব খোলেন রফিক উদ্দিন স্বপন। একইভাবে আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের মৌলভীবাজার শাখায় হিসাব খোলা হয় ২০০৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি ও ঢাকা ব্যাংকের ইমামগঞ্জ শাখায় ২০১২ সালের ১২ আগস্ট। হিসাব খোলার পর লেনদেনের পাশাপাশি বাকিতে ঋণপত্রও খোলে ব্যাংক তিনটি।
দুবাইয়ের মোহসেন আল ব্রাইকি জেনারেল ট্রেডিং কোম্পানি থেকে পণ্য আমদানির জন্য সোস্যাল ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে ঋণপত্র খোলা হলেও ৩৩টি ঋণপত্রের মধ্যে ১৮টির বিল অব এন্ট্রির সত্যতা ছিল না। এছাড়া ছয়টি ঋণপত্রের প্রকৃত নথি গ্রহণ না করায় পণ্য আমদানি হয়নি। অর্থাৎ পণ্য আমদানি না করেই ২৪টি ঋণপত্রের বিপরীতে ৯৬ লাখ ডলার দুবাইয়ে পাঠিয়ে দেয় মেসার্স ফয়েজ উদ্দিন অ্যান্ড কোম্পানি।
এছাড়া আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের মৌলভীবাজার শাখায় খোলা হয় ৫৮টি ঋণপত্র। তবে ১১টির প্রকৃত নথি ও ৩৩টির বিল অব এন্ট্রির সঠিকতা পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ কোনো পণ্যই আমদানি হয়নি। তার পরও বিদেশে পাঠানো হয়েছে ১ কোটি ৬৯ লাখ ডলার।
জানতে চাইলে আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. হাবিবুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, অর্থ আদায়ে আইনি প্রক্রিয়া চলমান। পাশাপাশি শাখা ব্যবস্থাপকেরও এজন্য শাস্তি হয়েছে।
ঢাকা ব্যাংকের ইমামগঞ্জ শাখায় দুবাইয়ের ওই প্রতিষ্ঠান থেকে পণ্য আমদানির জন্য ঋণপত্র খোলা হলেও পণ্য আসেনি। অথচ পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে ১২ লাখ ডলার। সব মিলিয়ে পণ্য না এনেই তিন ব্যাংকের মাধ্যমে ৭১টি ঋণপত্রের বিপরীতে বিদেশে পাঠানো হয়েছে ২ কোটি ৭৭ লাখ ডলার।
মোহসেন আল ব্রাইকি জেনারেল ট্রেডিং কোম্পানির ৪৯ শতাংশ শেয়ারের মালিক আবুল আহসান চৌধুরী। তার পাসপোর্ট নম্বর কিউ০৪৬৯৬২৭। বাকি ৫১ শতাংশ শেয়ারের মালিক সংযুক্ত আরব আমিরাতের মোহসেন আওয়াদ ওমর সালেহ আল ব্রাইকি। অস্ট্রেলিয়া, চীন, ভারত ও বাংলাদেশ থেকে খাদ্য, খেলনা, কসমেটিক ও কেমিক্যাল পণ্য আমদানি করে প্রতিষ্ঠানটি। আর রফতানি করে সৌদি আরব, বাংলাদেশ, ভারতসহ আরো কয়েকটি দেশে। ফয়েজ উদ্দিন অ্যান্ড কোম্পানি এর অন্যতম গ্রাহক। দুবাইভিত্তিক এ মোহসেন আল ব্রাইকি জেনারেল ট্রেডিং কোম্পানির কাছেই পাঠানো হয়েছে ২ কোটি ৭১ লাখ ডলার। এছাড়া আরো তিন রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানের কাছে গেছে ৬ লাখ ডলার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পণ্য আমদানি না করেই জাল নথি দাখিলের মাধ্যমে আমদানি মূল্য পরিশোধের মাধ্যমে বিদেশে অর্থ পাচার করা হয়েছে, যা মানি লন্ডারিং আইন, ২০১২-এর সংজ্ঞা অনুযায়ী মানি লন্ডারিং অপরাধ সংঘটনের নির্দেশক বলে প্রতীয়মান হয়।
যোগাযোগ করা হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মো. মাহফুজুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, পরিদর্শনে বেরিয়ে আসা তথ্যের ভিত্তিতে যে ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হয়, এক্ষেত্রেও তাই হয়েছে
Discussion about this post