ঝুলে গেছে রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সৈয়দ আবদুল হামিদের মেয়াদ বৃদ্ধি। এফবিসিসিআই নির্বাচনে ব্যাংকের দুই পরিচালকের পক্ষে প্রচারণা চালানো, সানমুন গ্রুপের ঋণ কেলেঙ্কারিতে সহায়তা ও এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকের এক খেলাপি পরিচালকের তথ্য গোপন— এ তিন কারণেই মূলত আটকে গেছে অগ্রণী ব্যাংক এমডির মেয়াদ বৃদ্ধি।
সংশোধিত ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী, বিশেষায়িত ছাড়া অন্য যেকোনো ব্যাংকে পরিচালক, ব্যবস্থাপনা পরিচালক বা প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নিয়োগ কিংবা পদায়নে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন বাধ্যতামূলক। অগ্রণী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও অর্থ মন্ত্রণালয় সৈয়দ আবদুল হামিদের মেয়াদ বৃদ্ধি অনুমোদন দিলেও তাতে অনাপত্তি দেয়নি কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
জানতে চাইলে অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান জায়েদ বখ্ত বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এমডির বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে যেসব অভিযোগ এসেছে, তা খতিয়ে দেখতে কমিটি হয়েছে। কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে। তবে এর সঙ্গে তার মেয়াদ বাড়ানোর কোনো সম্পর্ক নেই। এছাড়া দোষী প্রমাণ হলে ব্যবস্থা বা তিরস্কার করা যেতে পারে। আমরা অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে পরামর্শ করেই তার মেয়াদ বাড়ানোর সুপারিশ করেছি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক তার বিষয়ে বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত দেবে। তবে এখনো সিদ্ধান্ত না দেয়ার পেছনে বিশেষ কারণ থাকতে পারে।’
জানা গেছে, সদ্য অনুষ্ঠিত এফবিসিসিআই নির্বাচনে অগ্রণী ব্যাংকের দুই পরিচালক হাসিনা নেওয়াজ ও শামীম আহসান অংশ নেন। নির্বাচনকালীন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ আবদুল হামিদ ও বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তারা সেলফোনে এসএমএস পাঠিয়ে এবং বিভিন্ন মাধ্যমে তাদের পক্ষে প্রচারণা চালান। এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তার কাছে ব্যাখ্যা চাইলে তিনি আংশিক সত্যতা স্বীকার করেন।
এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সৈয়দ আবদুল হামিদের কাছে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়, নির্বাচনী প্রচারণায় আপনার সেলফোন ব্যবহারের বিষয়টি সর্বাংশে সত্য নয় মর্মে যে বক্তব্য প্রদান করা হয়েছে, তা অস্পষ্ট। সুনির্দিষ্ট অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এ ধরনের অস্পষ্ট জবাব অনভিপ্রেত। ভবিষ্যতে আপনার কর্মপরিধির সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকার ব্যাপারে আপনাকে কঠোরভাবে সতর্ক করা হলো।
অগ্রণী ব্যাংকের খেলাপি গ্রাহক মিশম্যাক ডেভেলপমেন্ট গ্রুপ। চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী মিজানুর
রহমান শাহীনের মালিকানাধীন এ গ্রুপের পরিচালক তার স্ত্রী কামরুন নাহার সাথী। অগ্রণী ব্যাংকে ওই গ্রুপের প্রায় ২০০ কোটি টাকার ঋণ রয়েছে, যার পুরোটাই এখন খেলাপি। তার পরও এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকের পরিচালক পদে বহাল রয়েছেন কামরুন নাহার সাথী। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে পাঠানো অগ্রণী ব্যাংকের প্রতিবেদনে কামরুন নাহার সাথীর বিষয়টি গোপন করা হয়েছে।
এদিকে সানমুন গ্রুপের কর্ণধার মিজানুর রহমান মিজান ও তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৩০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার ঘটনায় সৈয়দ আবদুল হামিদের জড়িত থাকার বিষয়ে বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরে গত মাসে অর্থ মন্ত্রণালয় ও অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যানকে চিঠি দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। চিঠিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানায়, এমডির জ্ঞাতসারে ও তার প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিতে ব্যাংকটির প্রিন্সিপাল শাখার একটি চক্র পরিচালনা পর্ষদকে বিভ্রান্ত করে মিজানুর রহমান মিজান ও তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে ঋণ অনুমোদন ও বিতরণ করে আমানতকারীদের প্রায় ৩০০ কোটি টাকা ঝুঁকিতে ফেলেছে। সার্বিকভাবে এর দায়ভার ব্যাংকের এমডির ওপর বর্তায়। এসব কারণেই মূলত আটকে গেছে অগ্রণী ব্যাংক এমডির মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়টি।
অগ্রণী ব্যাংকের এমডি হিসেবে সৈয়দ আবদুল হামিদের মেয়াদ শেষ হচ্ছে আগামী ১০ জুলাই। সম্প্রতি এক বছরের জন্য তার মেয়াদ বৃদ্ধি অনুমোদন করে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ। পর্ষদের অনুমোদনের পর অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগও তার মেয়াদ এক বছর বাড়ানোর বিষয়টি অনুমোদন করে। এর পর অনাপত্তির জন্য তা বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠানো হয়।
Discussion about this post