পে-অর্ডার ইস্যু হয়েছে ফারমার্স ব্যাংকের পটুয়াখালী ও দুমকি শাখা থেকে। তবে কবে ও কার নামে এ পে-অর্ডার ইস্যু হয়েছে তার কোনো নথি ব্যাংকে নেই। অনিয়মের এ চিত্র উঠে এসেছে ব্যাংকটির অভ্যন্তরীণ পরিদর্শনেই।
কল মানিতে অন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে সরকারি বন্ডে বিনিয়োগ করেছে মিডল্যান্ড ব্যাংক। আবার ন্যাশনাল ব্যাংকের গ্যারান্টির বিপরীতে সেলফোন অপারেটর সিটিসেলকে ৪০ কোটি টাকা ঋণ দিয়ে বিপাকে আছে মেঘনা ব্যাংক। আর হাজার কোটি টাকা নিয়ে পলাতক এক ব্যবসায়ীর স্ত্রীর পরিচালক হওয়া নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তোপের মুখে পড়েছে এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক। যাত্রার মাত্র দুই বছরের মধ্যে এভাবেই নানা অনিয়মে জড়িয়ে পড়েছে নতুন অনুমোদন পাওয়া ব্যাংকগুলো।
সরকার নতুন করে নয়টি ব্যাংকের অনুমোদন দেয় ২০১২ সালে। এর মধ্যে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে ব্যাংকিং ব্যবস্থার আওতায় আনার স্বপ্ন দেখিয়ে অনুমোদন পায় স্থানীয় উদ্যোক্তাদের ছয় ব্যাংক। আর রেমিট্যান্স ও বিদেশী বিনিয়োগ আনার প্রতিশ্রুতিতে অনুমোদন পায় প্রবাসীদের উদ্যোগে গঠিত তিন ব্যাংক। ২০১৩ সালের প্রথম প্রান্তিকের পর ধাপে ধাপে বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করে ব্যাংকগুলো। তবে যাত্রার পরই চেয়ারম্যানদের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পদ ছাড়তে হয় কয়েকটি ব্যাংকের এমডিকে। ব্যাংক পরিচালনা নিয়ে পর্ষদের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পদত্যাগ করতে হয়েছে মিডল্যান্ড ব্যাংকের এমডি একেএম শহীদুলকে। দৈনন্দিন ব্যাংক পরিচালনায় হস্তক্ষেপের কারণে পদত্যাগ করেন মেঘনা ব্যাংকের এমডি কাইজার এ চৌধুরী।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর এসকে সুর চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, নতুন হওয়ায় ব্যাংকগুলো কিছু ভুল-ত্রুটি করছে। প্রতিনিয়ত তাদের নিয়মের মধ্যে থেকে ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনার নির্দেশ দেয়া হচ্ছে। ব্যাংক পরিচালনা করতে গিয়ে তারা যাতে কোনো ধরনের ঝুঁকিতে না পড়ে নির্দেশনা দেয়া হচ্ছে সে ব্যাপারেও।
পে-অর্ডার ইস্যুতে বড় ধরনের জালিয়াতি হয়েছে দি ফারমার্স ব্যাংকের পটুয়াখালী ও দুমকি শাখায়। ব্যাংকটির অভ্যন্তরীণ পরিদর্শনে অনিয়মের বিষয়টি উঠে এলেও এখন পর্যন্ত কারো বিরুদ্ধেই কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ব্যাংকটির দুটি শাখা থেকে পে-অর্ডার ইস্যু করা হলেও এর কোনো নথি নেই। এমনকি কার নামে এটা ইস্যু করা হয়েছে তারও উল্লেখ নেই পে-অর্ডারের বইয়ে। পে-অর্ডারের মুড়িতেও কোনো উল্লেখ নেই। ব্যাংকের নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কোনো ধরনের বয়স ও অভিজ্ঞতা বিবেচনায় না নিয়েই জনবল নিয়োগদানের অভিযোগ রয়েছে ব্যাংকটির বিরুদ্ধে। এর পরিপ্রেক্ষিতে নীতিমালা চূড়ান্ত করে নিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ব্যাংকটিকে নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
ফারমার্স ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক একেএম শামীম এ প্রসঙ্গে বলেন, ভুল করে এমনটি হয়ে থাকতে পারে। তবে অভ্যন্তরীণ পরিদর্শনে এলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
যাত্রার পর নতুন ব্যাংকগুলোর অধিকাংশই ঋণ প্রদানের উদ্দেশ্যে বড় গ্রুপগুলোর পেছনে ছুটেছে। মিডল্যান্ড, সাউথ বাংলা ও ইউনিয়ন ব্যাংকের ঋণের বড় অংশই গেছে এসব গ্রাহকের কাছে, যা ঝুঁকিতে ফেলছে ব্যাংকগুলোকে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কল মানি থেকে ঋণ নিয়ে সরকারি বন্ডে বিনিয়োগ করে মিডল্যান্ড ব্যাংক। এর মাধ্যমে মুনাফা অর্জনের চেষ্টা চালায় ব্যাংকটি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শনে বিষয়টি বেরিয়ে আসার পর এ কার্যক্রম থেকে সরে আসে ব্যাংকটি।
কার্যক্রম শুরুর দেড় বছরের মধ্যে প্রধান কার্যালয় স্থানান্তর করেছে নতুন অনুমোদন পাওয়া মেঘনা ব্যাংক। এর মাধ্যমে ভাড়া ও অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জার নামে অপ্রয়োজনীয় অর্থ ব্যয়ের অভিযোগ রয়েছে ব্যাংকটির বিরুদ্ধে। এছাড়া যাত্রার পরই ব্যাংকটি ন্যাশনাল ব্যাংকের গ্যারান্টির বিপরীতে সেলফোন অপারেটর সিটিসেলকে ৪০ কোটি টাকা প্রদান করে। সময় পেরিয়ে গেলেও এ অর্থ ফেরত পায়নি মেঘনা ব্যাংক। সিটিসেলের মতো প্রতিষ্ঠানটি ৪০ কোটি টাকা প্রদানের ঘটনায় ব্যাংকটির ঋণ ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এ বিষয়ে মেঘনা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ নুরুল আমিন বলেন, ন্যাশনাল ব্যাংকের গ্যারান্টির বিপরীতেই এ অর্থ দেয়া হয়েছিল। আদালতে বিষয়টি চূড়ান্ত হয়েছে। চলতি সপ্তাহেই সব অর্থ ফেরত পাওয়া যাবে।
অনিয়ম বন্ধে ব্যাংকগুলোর জবাবদিহিতা বাড়ানোর ওপর জোর দেন এ ব্যাংকার। তিনি বলেন, ‘নতুন-পুরনো সব ব্যাংকের জন্য একই নিয়ম, একই নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান। যেসব অনিয়মের খবর পাওয়া যাচ্ছে, তার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। তা না হলে অনিয়ম আরো উৎসাহিত হবে। ব্যাংকগুলোকেও নিজেদের মধ্যে জবাবদিহিতা বাড়াতে হবে। নিয়ম ভাঙলে যথাসময়ে শাস্তির আওতায় আনতে হবে।’
মেঘনা, মিডল্যান্ড, সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স, ইউনিয়ন, মধুমতি ও ফারমার্স ব্যাংকের সঙ্গে গত ৫ এপ্রিল সভা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এসব ব্যাংকের কাছে পাঠানো বাংলাদেশ ব্যাংকের সভার সিদ্ধান্তে বলা হয়, ব্যাংকিং নিয়মাচার যথাযথভাবে অনুসরণ না করে আগ্রাসী ঋণ প্রবৃদ্ধির দিকে মনোযোগী হওয়ায় ব্যাংকগুলো নানা ঝুঁকির সম্মুখীন হয়েছে। গভর্নর এসব অনিয়মে অসন্তোষ প্রকাশ করেন ও কঠোরভাবে সতর্ক করেন।
সভায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যাংক পরিদর্শন বিভাগ-১-এর মহাব্যবস্থাপক অশোক কুমার দে বলেন, নতুন ব্যাংকগুলো অন্যান্য ব্যাংক থেকে ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ কিনছে, অন্য ব্যাংকের পরিচালকদের অধিক পরিমাণে ঋণ দিচ্ছে ও অস্বাভাবিক ঋণসীমা নির্ধারণ করছে।
Discussion about this post