মুন বাংলাদেশ লিমিটেডের কর্ণধার মিজানুর রহমান মিজান ও তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে দেয়া প্রায় ৩০০ কোটি টাকা ঋণ অনিয়মের ঘটনায় অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সৈয়দ আবদুল হামিদের সংশ্লিষ্টতা খুঁজে পেয়েছে ব্যাংকটির অডিট কমিটি। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে এ ঋণ কেলেঙ্কারিতে এমডির সংশ্লিষ্টতা বেরিয়ে আসার পর পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের সমন্বয়ে এ কমিটি গঠন করা হয়।
আরাস্তু খানের নেতৃত্বে কমিটির সদস্যরা হলেন ইঞ্জিনিয়ার মো. আব্দুস সবুর, অ্যাডভোকেট বলরাম পোদ্দার ও আলতাফ হোসেন মোল্লা।
জানতে চাইলে অগ্রণী ব্যাংক অডিট কমিটির চেয়ারম্যান আরাস্তু খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এ অনিয়মের ঘটনায় এমডির যে সংশ্লিষ্টতা বাংলাদেশ ব্যাংক খুঁজে পেয়েছে, একই তথ্য বেরিয়ে এসেছে আমাদের তদন্তেও। বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে পুরোপুরি না হলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আমরা একমত। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশে তদন্ত হয়েছে। ব্যবস্থা নেয়ার থাকলেও তারাই নেবে।’
অডিট কমিটির তদন্ত অনুযায়ী, যেসব কর্মকর্তা এ ঋণ কেলেঙ্কারিতে জড়িত ছিলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শনে তাদের সংশ্লিষ্টতা বেরিয়ে আসার পর ২০১৪ ও ২০১৫ সালে চার দফায় নির্দেশনা পাওয়া গেলেও শাস্তিমূলক কোনো ব্যবস্থা নেননি অগ্রণী ব্যাংকের এমডি। এর মাধ্যমে তিনি ঘটনাটি ধামাচাপা দিয়ে নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা করেছেন। এ ঘটনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক অগ্রণী ব্যাংকের প্রিন্সিপাল শাখার তত্কালীন মহাব্যবস্থাপক মিজানুর রহমান খানের বিরুদ্ধে কয়েক দফায় ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেয়। কিন্তু কোনো ব্যবস্থা গ্রহণের পরিবর্তে মহাব্যবস্থাপক (জিএম) থেকে উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) পদে পদোন্নতি পান এ কর্মকর্তা।
ঋণ অনিয়মের বিষয়টি জানিয়ে এর আগে অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান এবং ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিবের কাছে চিঠি পাঠায় বাংলাদেশ ব্যাংক। তাতে বলা হয়, ‘এমডির জ্ঞাতসারে ও তার প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিতে ব্যাংকটির প্রিন্সিপাল শাখার একটি চক্র পরিচালনা পর্ষদকে মিথ্যা তথ্য দিয়ে মিজানুর রহমান মিজান ও তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে ঋণ অনুমোদন ও বিতরণ করেছে। এর মাধ্যমে আমানতকারীদের প্রায় ৩০০ কোটি টাকা ঝুঁকিতে ফেলা হয়েছে; সার্বিকভাবে যার দায়ভার ব্যাংকের এমডির ওপর বর্তায়।’
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শনে অনিয়ম বেরিয়ে আসার পর প্রিন্সিপাল শাখার তত্কালীন মহাব্যবস্থাপক ও বর্তমান উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মিজানুর রহমান খানসহ প্রিন্সিপাল শাখার নয়জন চিহ্নিত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যথোপযুক্ত প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা দেয়া হলেও তা পরিপালন করা হয়নি। এমডি তাদের শাস্তি দেয়ার পরিবর্তে শুধু সতর্ক করেন। এভাবে গুরুতর অনিয়মের দায় থেকে তাদের অব্যাহতি প্রদানেই স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়, এমডির প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিতেই এ ঋণ অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে। দায়ভার এড়ানোর জন্যই শুধু তাদের সতর্ক করে বিষয়টিকে আড়াল করার অপকৌশল অবলম্বন করেছেন তিনি।
অভিযোগ তদন্ত করে অগ্রণী ব্যাংকের অডিট কমিটি বলেছে, কোনো প্রকার দুর্নীতি-অনিয়ম হলে বিদ্যমান আইন অনুযায়ী দায়ী ব্যক্তিরা শাস্তি পাবেন। অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে এমডির কর্তব্য ছিল দায়ীদের বহিষ্কার ও তদন্ত কমিটি করে উপযুক্ত শাস্তি দেয়া। কিন্তু তিনি তা না করে শুধু সতর্ক করেছেন, যা কমিটির কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শনমতে, মুন বাংলাদেশ লিমিটেডকে ভবনটি নির্মাণকাজের জন্য যে ঋণ প্রদান করা হয়, তার নকশা ১৯৯৮ সালে অনুমোদন হয়, ২০০২ সালে তা বাতিল হয়ে যায়। নকশা বাতিলের ১০ বছর পর ২০১২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি প্রতিষ্ঠানটিকে ঋণ প্রদানের জন্য পর্ষদের কাছে উপস্থাপন করা হয়, যার সঙ্গে এমডি সরাসরি জড়িত। এমডি এক্ষেত্রে পেশাগত দায়িত্বশীলতা প্রদর্শনে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন বলে মনে করে অডিট কমিটি।
বাংলাদেশ ব্যাংক এমডির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট ১২টি অনিয়মের তথ্য দিয়েছে ব্যাংকটির চেয়ারম্যানের কাছে। ব্যাংকটির অডিট কমিটি সবক্ষেত্রেই বলেছে, এসব এমডির দায়িত্বের মধ্যে পড়ে এবং তিনি সে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছেন। এমডির এসব দায়িত্ব অন্যদের ওপর বর্তায় বলে দাবি করলেও কমিটির কাছে তা গ্রহণযোগ্য নয়।
এ অনিয়মের দায়ভার এমডির ওপর বর্তায়— কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে অডিট কমিটি বলেছে, এমডি তার জবাবে এসব অনিয়মের দায় শাখা ও ক্রেডিট কমিটির ওপর চাপিয়েছেন। কিন্তু কমিটির মতে, এমডির এ ব্যাখ্যা একজন প্রধান নির্বাহীর দায়িত্বের ব্যাপারে তা অসচেতনতার প্রমাণ দেয়। সর্বোপরি যেসব কর্মকর্তার ওপর তিনি দায় চাপিয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা না নেয়া এমডির ভূমিকাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে বলে মনে করে কমিটি।
এসব বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র মো. মাহফুজুর রহমান বলেন, ব্যাংক কোম্পানি আইন লঙ্ঘন করার প্রমাণ মিললে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে। এর কোনো ব্যত্যয় হবে না।
Discussion about this post