কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার সেরকান্দি গ্রামের খামারি পবন শেখ। পশুখাদ্য কেনার প্রয়োজন পড়লেই চড়া সুদে ঋণ নেন স্থানীয় এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে। তিন থেকে ছয় মাস মেয়াদি এ ঋণের জন্য তাকে সুদ পরিশোধ করতে হয় প্রতি লাখে ১০ হাজার টাকা।
ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার গ্রাম মাধবপুর। সেখানেও চলছে অনানুষ্ঠানিক সুদের ব্যবসা। জরুরি প্রয়োজন পড়লেই চড়া সুদে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে ঋণ নিচ্ছেন গ্রামবাসী। তিন থেকে ছয় মাস মেয়াদি এসব ঋণে সুদ পরিশোধ করতে হচ্ছে প্রতি হাজারে ৬০০-৮০০ টাকা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের অর্থনীতিতে যে বিপুল অঙ্কের কালো টাকা রয়েছে তার একটি অংশ যাচ্ছে আবাসন বাজারে। একটি অংশ আবার চলে যাচ্ছে দেশের বাইরে। বাকিটা অনানুষ্ঠানিক সুদের বাজারে চক্রাকারে খাটছে। গ্রাম-গঞ্জে এমনকি শহরাঞ্চলেও এর বিস্তৃতি ঘটছে।

দেশের বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জরুরি ব্যবসায়িক প্রয়োজনেই মূলত চড়া সুদে অনানুষ্ঠানিক এ ঋণ নিয়ে থাকেন অনেকে। ঋণ পরিশোধের তাগিদ থেকেও মহাজনি ঋণদাতাদের শরণাপন্ন হন কেউ কেউ। এছাড়া নিম্ন আয়ের মানুষ, বিশেষ করে শহরের বস্তিবাসী পারিবারিক বিভিন্ন প্রয়োজনে এ ধরনের ঋণ নিয়ে থাকেন। সারা দেশেই অনানুষ্ঠানিক এ সুদের ব্যবসা চলছে। এলাকাভেদে এর ভিন্ন ভিন্ন নামও রয়েছে। কোথাও তা মহাজনি সুদ, কোথাও আবার কারেন্ট সুদের ব্যবসা নামে পরিচিত। আর রাজধানীতে অনানুষ্ঠানিক এ সুদের ব্যবসা সবচেয়ে বেশি চলে পুরান ঢাকার কিছু এলাকায়। তাত্ক্ষণিক ঋণ দিয়ে দৈনিক ভিত্তিতে সুদ আদায়ের এ ব্যবসা চলছে চট্টগ্রামেও।
দেশে অনানুষ্ঠানিক এ সুদের ব্যবসা ক্রমে বড় হলেও এর সঠিক হিসাব নেই সরকারি কোনো সংস্থার কাছে। তবে ‘শ্যাডো ব্যাংকিং’ নিয়ে একটি জরিপ পরিচালনার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) অধ্যাপক শাহ মো. আহসান হাবিবের নেতৃত্বে এ জরিপ পরিচালনা করা হবে। তিন মাসের মধ্যে জরিপ সম্পন্ন করে একটি সুপারিশ প্রণয়ন করা হবে; পরবর্তীতে যা নীতিসহায়তা হিসেবে ব্যবহার করবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
জরিপ পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত অন্য সদস্যরা হলেন— বাংলাদেশ ব্যাংকের উপমহাব্যবস্থাপক সাইফুল ইসলাম ও আশরাফুল আলম, যুগ্ম পরিচালক মো. আলাউদ্দিন, শাহরিয়ার সিদ্দিকী, মো. জহির হোসেন, আমিনুর রহমান চৌধুরী, উপপরিচালক শাহ জিয়া-উল হক, আসিফ ইকবাল ও সহকারী পরিচালক জোবায়ের হোসেন।
অধ্যাপক শাহ মো. আহসান হাবিব এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, নিয়ন্ত্রণহীন ব্যাংকিং সেবা বেড়ে যাচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক সবাইকে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির আওতায় আনতে চায়। এজন্য কী সংখ্যক মানুষ এ সেবা নিচ্ছে বা প্রদান করছে, তার হিসাব থাকাটা জরুরি। এ উদ্দেশ্যেই জরিপটি পরিচালনা করা হবে।
অনানুষ্ঠানিক ঋণগ্রহীতারা বলছেন, ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ পেতে বিভিন্ন নথিপত্র প্রয়োজন হয়। তাত্ক্ষণিক ঋণ পেতে তাই চড়া সুদে মহাজনি সুদ ব্যবসায়ীদের শরণাপন্ন হন তারা।
কুমারখালীর পবন শেখ বলেন, ব্যাংকের ঋণ পেতে বিভিন্ন ধরনের নথিপত্রের পাশাপাশি অনেক সময়ও লেগে যায়। মর্টগেজ হিসেবে স্থায়ী সম্পত্তি দেখাতে হয়। এসব ঝামেলা এড়াতেই চড়া সুদে মহাজনদের কাছ থেকে ঋণ নিতে হয়।
নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্যে চড়া সুদে ঋণ নেয়ার প্রবণতা বেশি বলে জানান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর। তিনি বলেন, গ্রামাঞ্চলে এ ধরনের লেনদেন বেশি হয়, যা পুরোপুরি অবৈধ। সরকার উদ্যোগ নিলে এটা কমে আসতে পারে। তবে প্রায় সব দেশেই কমবেশি এমন প্রথা চালু আছে। এটা কমাতে হলে আর্থিক জ্ঞানের পাশাপাশি সচ্ছলের সংখ্যা বাড়াতে হবে।
তথ্যমতে, দেশের জনগোষ্ঠীর বড় অংশ এখনো ব্যাংকিং সেবার বাইরে রয়েছে। ব্যাংক হিসাব রয়েছে দেশের ২৮ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষের। এর মধ্যে শহরাঞ্চলে ৪৪ দশমিক ৭ ও গ্রামাঞ্চলের ২৪ দশমিক ১ শতাংশ মানুষ ব্যাংক হিসাবের আওতায় রয়েছে। ব্যাংক হিসাব বিবেচনায় বিভাগভিত্তিক সবচেয়ে এগিয়ে চট্টগ্রাম আর পিছিয়ে রংপুর। চট্টগ্রাম বিভাগের ৩৬ দশমিক ৮ শতাংশ মানুষের ব্যাংক হিসাব রয়েছে। আর রংপুর বিভাগে এ হার মাত্র ১২ দশমিক ৮ শতাংশ। বহুমাত্রিক সূচক নির্ধারণে পরিচালিত গুচ্ছ জরিপ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস) ২০১২-১৩তে এমন চিত্র পাওয়া গেছে। ইউনিসেফের আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) জরিপটি করেছে।
আর বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, গত ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭ কোটি ৭৮ লাখ ৭৬ হাজার ৪৫৯। এর বাইরে মোবাইল ব্যাংকিং হিসাব রয়েছে ২ কোটি ৯২ লাখ ১২ হাজার। ফলে দেশে ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১০ কোটি ৭০ লাখ ৮৮ হাজার ৪৫৯।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহীম খালেদ বলেন, একজন ব্যক্তি কতটি ব্যাংক হিসাব খুলতে পারবেন, তার কোনো নির্দেশনা নেই। এজন্য ব্যাংক হিসাব অনেক হলেও প্রকৃত হিসাবধারীর সংখ্যা বেশ কম।

Discussion about this post