ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পড়াশোনা শেষে ১৯৮১ সালে এএনজেড গ্রীন্ডলেজ ব্যাংকের যোগ দেন। এর পর ধাপে ধাপে একই ব্যাংকের করপোরেট ব্যাংকিং বিভাগের প্রধান হন। ইর্স্টার্ন ব্যাংক লিমিটেড ও দ্য সিটি ব্যাংকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে ১২ বছরেরও বেশি দায়িত্ব পালন করেন। ছিলেন ব্যাংকিং খাতের নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যানও। ৩২ বছরের ব্যাংকিং পেশা ছেড়ে নিজে গড়ে তুলেছেন আরএসএ অ্যাডভাইজরি লিমিটেড। বর্তমানে পরিচালক হিসেবে রয়েছেন ব্র্যাক ব্যাংকের পাশাপাশি বিকাশেও। ব্যাংকিং খাতের চালচিত্র, সম্ভাবনা, চ্যালেঞ্জসহ নানা বিষয়ে সম্প্রতি তিনি বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন।
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাকিব তনু
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে ব্যাংকিং খাত কী ভূমিকা রেখেছে?
বাংলাদেশে সে রকমভাবে কোনো ডেভেলপমেন্ট ফিন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশন ছিল না, ফলে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো সেখানে বেশ ভালো ভূমিকা রেখেছিল। তারা প্রকৃতপক্ষে শিল্প খাতকে সহায়তা করে গিয়েছিল। আজকের সাড়ে ৬ শতাংশ হারে অর্জিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পেছনে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর বড় অবদান রয়েছে। আগে প্রবৃদ্ধিতে সহায়তা জোগানো সহজ ছিল। কারণ তখন আমাদের অর্থনীতি ছিল উঠতি। যা-ই উত্পাদন হতো, তার পুরোটাই ভোগ হতো। হোক সেটি অভ্যন্তরীণ অথবা রফতানি। ভবিষ্যতে এক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ আসবে। চাহিদা বাড়িয়ে না তোলা গেলে উত্পাদন বাড়ানো যাবে না। নতুবা বাড়তি উত্পাদন অবিক্রীত থেকে যাবে। এগুলোই হচ্ছে রিস্ক বা চ্যালেঞ্জ। বিশ্ব অর্থনীতি এখন পরিবর্তনশীল। ক্ষণে ক্ষণে এটি রঙ বদলাচ্ছে। আলোচনার বিষয় হলো, অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় আমাদের উদ্যোক্তারা কেমন দক্ষতা দেখাবে। গ্লোবাল ইকোনমিতে আমাদের এক্সপোর্টাররা কীভাবে পারফর্ম করবে, দক্ষতার লেভেল একটি বিরাট ইস্যু হয়ে দাঁড়াবে। সস্তা শ্রমিক দিয়ে আর চলবে না। দক্ষতা, টাইম লিমিটস ও কমিটমেন্ট অব ডেলিভারি— এ তিন বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আর অভ্যন্তরীণ শিল্প বিকাশে অবকাঠামো জরুরি। গত সাত বছরে অবকাঠামোর অনেক উন্নয়নকাজ হয়েছে। এখনো বিশ্বব্যাংকের মতে আমাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, বিদ্যুত্ ও জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন জোগান নিশ্চিত করা। এখানে বিনিয়োগের চ্যালেঞ্জ হলো কোম্পানি তৈরি, জমি পাওয়া, গ্যাস ও বিদ্যুতের সংযোগ পাওয়া। রাস্তাগুলো তৈরি হচ্ছে; ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক চারলেনে উন্নীত হচ্ছে। অবকাঠামো উন্নত হলে কাঁচামালের যোগাযোগ তৈরি হবে। ব্যাংকিং খাতকে প্রস্তুতি নিতে হবে আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায়। ব্যাংকিং খাত গত ৪০ বছরে শিল্পায়নে বড় ভূমিকা পালন করেছে। তখন কোনো ডিএফআই ছিল না। ডেভেলপমেন্ট ফার্মেশন ইনস্টিটিউশনগুলো দীর্ঘ সময় ছিল না। তাই আমাদের উদ্যোক্তারা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে শিল্প-কারখানা তৈরি করেছেন। আমাদের ব্যাংকিং ব্যবসাটা হলো ক্রেতানির্ভর। ক্রেতা যদি পারফর্ম করতে পারেন, তাহলে আমি পারফর্ম করতে পারব। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হলে গুণগত মান যাচাই করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ব্যাংকগুলোকে প্রজেক্ট ফিন্যান্স করতে হলে প্রজেক্ট ফিন্যান্সের ঝুঁকিগুলো বুঝতে হবে। নতুন শিল্পায়নের চাহিদা তৈরি করতে হবে। নতুন বছরে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে ব্যাংকের মূলধন। ব্যাসেল-৩-এ যখন আমরা যাব, তখন কিন্তু অনেক কিছু এসে পড়বে। আমার ধারণা, সাত-আটটি ব্যাংক পরিকল্পনা করছে রেডিমেন্সে যেতে পারবে কিনা, বাকিরা এখনো পরিকল্পনার মধ্যেই আছে। এ কথা বললে হয়তো সবাই প্রোটেস্ট করবে। কারণ ব্যাসেল-থ্রি ইজ নট অনলি এ ক্যাপিটাল, ব্যাসেল-থ্রি ইজ এ গেম অব রিস্ক ম্যানেজমেন্ট। সম্পূর্ণটাই রিস্ক, অপারেশন রিস্ক, মার্কেট রিস্ক, ক্যাপিটাল রিস্ক। এ রিস্ক গেমে আপনি কোথায় আছেন? কিছু কিছু হিসাব-নিকাশ করা হয়ে থাকে যে— ব্যাংক, নন-ব্যাংক আর ইন্স্যুরেন্সের ক্যাপিটাল রিস্ক মিলে প্রয়োজন পড়বে ১ বিলিয়ন ডলার, প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা। এ ক্যাপিটাল কোত্থেকে আসবে এবং এ ক্যাপিটালের জন্য প্ল্যানিংটা কী হচ্ছে, এগুলোই কিন্তু বিরাট ইস্যু হয়ে দাঁড়াবে আগামীতে— এটিই চ্যালেঞ্জ। এখন ঋণ দিলেই সেটি ফেরত আসার গ্যারান্টি আগের মতো আর নেই। আগে ব্যাংকের ব্যবসা ছিল ট্রেডিং। আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে ইনফ্রাস্ট্রাকচারে ফিন্যান্সিং। আমাদের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোয় বিশ্লেষণী ক্ষমতা নেই বললেই চলে। আমাদের ডিপোজিট স্ট্রাকচারও নেই। এখানে অনেক ব্যাংক রয়েছে, এতগুলো ব্যাংক থাকাই কি একটি চ্যালেঞ্জ? সবাই মূলধন জোগাড় করতে পারবে? দুটি ব্যাংক মিলে যদি একটি হয়ে যায়, তাহলে ক্যাপিটাল বেড়ে যায়, খরচ অর্ধেক হয়ে যায়। আগামীতে এসব বিষয় সামনে চলে আসবে।
বাংলাদেশে কি দুই বা ততধিক ব্যাংক একীভূত হওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন?
বাংলাদেশে ব্যাংক একীভূতকরণের নীতিমালা আছে। আমি ২০১৬তে একীভূত হওয়ার সুযোগ দেখি। কিন্তু আমার ধারণা, ২০১৯-২০-এ যখন সম্পূর্ণভাবে কমপ্লায়েন্ট হওয়ার সময় চলে আসবে, তখন ব্যাংকগুলোর একীভূতই একমাত্র রাস্তা হয়ে যাবে। আজ টেলিকম ইন্ডাস্ট্রি দেখুন, এয়ারটেল ২৫ শতাংশ শেয়ার নিয়ে মার্জ করছে রবির সঙ্গে। কারণ একলা চলা যায় না। দুটি ব্যাংক যখন একীভূত হয়, তখন পাশাপাশি দুটি ব্রাঞ্চের একটি বন্ধ হয়ে যায়, অ্যাডমিশন ডিপার্টমেন্ট এক হয়ে যায়, এইচআর ডিপার্টমেন্ট এক হয়ে যায়, হেড অফিস এক হয়ে যায়। সুতরাং খরচের হিসাবটা অর্ধেক হয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে ক্যাপিটাল দ্বিগুণ হয়ে যাচ্ছে। এতে ব্যাংক ও গ্রাহক উভয়ই সুবিধা পাবে।
আর্থিক খাতের আশার দিকগুলো কী?
বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত কোনো ব্যাংক বন্ধ হয়ে যায়নি। আমরা ম্যানেজ করে রাখতে পেরেছি, এটিই আমাদের বড় শক্তি। আমরা বলছি, বাংলাদেশ মিলেনিয়াম কান্ট্রি হবে। মিলেনিয়াম ইনকাম কান্ট্রি কিন্তু ১ হাজার ৪৬ ডলার থেকে শুরু হয়। বর্তমানে আমাদের মাথাপিছু আয় ১ হাজার ৩০০ ডলার। জনসংখ্যা যদি অর্ধেক হতো, তাহলে আমাদের এ মাথাপিছু আয় হতো ৩ হাজার ডলার। আমাদের জনসংখ্যার মাথাপিছু গড়ে এখন জিডিপি হিসাব করা হচ্ছে। প্রবৃদ্ধিটাও সেভাবে হিসাব করা হচ্ছে। চ্যালেঞ্জগুলো ঠিক ২০১৬তে নয়, যখনই এ বড় অবকাঠামো প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন হয়ে যাবে, তখন আসবে। সে সময়ে একটি বিনিয়োগ বা চাহিদা যা-ই বলেন, অভ্যন্তরীণ চাহিদা তৈরি হবে। বাংলাদেশের বর্তমানে সবচেয়ে বড় শক্তি হলো ইন্টারনাল ডিমান্ড ক্রিয়েশন। মধ্যবিত্তের চাহিদা তৈরি করা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশে এটি হচ্ছে। মধ্যবিত্তের সংখ্যাও বাড়ছে। এ কারণে প্রাণ, স্বপ্ন, ওয়ালটনের মতো কোম্পানিগুলোর প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। পশ্চিমা দেশগুলোয় এ ইন্টারনাল ডিমান্ড তৈরি হচ্ছে না। আমরা এটি তৈরি করছি। আশার কথা এটিই। ব্যাংকগুলো এখন বড় গ্রুপের পেছনে না ছুটে মধ্যম শ্রেণীর প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করছে। এটিই ভবিষ্যত্ চাহিদা তৈরি করবে।
ব্যাসেল-৩ নির্ধারিত সময়ে বাস্তবায়ন করতে না পারলে আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে ব্যাংকগুলো কী ধরনের সমস্যায় পড়বে?
ব্যাসেল-৩ হচ্ছে এরিয়াভিত্তিক। ইউরোপ সিদ্ধান্ত নিয়েছে ২০১৫-১৮, বাংলাদেশ বলেছিল ২০১৬-১৯। আমার ধারণা, এটি ২০২০ সাল গড়াবে। ব্যাসেল-৩, ব্যাসেল-২ হচ্ছে এমআরপি পাসপোর্টের মতো। সব দেশ যেখানে এমআরপিতে চলে গেছে, বাংলাদেশ সেখানে পুরোপুরি এখনো যেতে পারেনি। ব্যাসেল-৩ সে রকমই। সময়মতো বাস্তবায়ন করতে না পারলে ধীরে ধীরে বিদেশী ব্যাংকগুলো বাংলাদেশের সঙ্গে লেনদেন কমিয়ে দেবে। ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক মহল থেকে চাপ আসবে। আমার ধারণা, ২০২০ সালের মধ্যে বিশ্বের সব ব্যাংক ব্যাসেল-৩-এ চলে যাবে। বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকেও এ লক্ষ্যে কাজ করতে হবে। আমরা যদি প্রবৃদ্ধির হার ৭ শতাংশেরও বেশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে চাই, তবে জিডিপির ২৫-৩০ শতাংশ পুনর্বিনিয়োগ করতে হবে। আমাদের সঞ্চয় হচ্ছে জিডিপির ১৩-১৪ শতাংশ। এ সঞ্চয় দিয়ে কিছুই হবে না। সুতরাং বিদেশী বিনিয়োগ লাগবেই। সেক্ষেত্রে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ব্যাংকগুলোকে তাল মিলিয়ে চলতে হবে। সেক্ষেত্রে ব্যাসেল-৩ বাস্তবায়ন বাধ্যতামূলক।
বর্তমানে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকরা কি স্বাধীনভাবে ভূমিকা রাখতে পারছেন?
আমাদের দেশে ব্যাংকের এমডি ও চেয়ারম্যানদের ভূমিকা কী, তা আইনের মাধ্যমে স্পষ্ট করা আছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এখানে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ একটু বেশিই ভূমিকা পালন করছে। তবে তারা যদি ব্যাংকের ব্যাসেল-৩ বাস্তবায়ন নিয়ে কাজ করত, পরিকল্পনা করত, তাহলে ভালো হতো। কিন্তু তারা করছে উল্টোটা। ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের স্বাধীনভাবে কাজ করতে এখনো লড়াই করতে হয়। অনেক উন্নতি হয়েছে, আবার শুনি পিছিয়েও গেছি অনেক। পিছিয়ে যাওয়ার হারটাই বেশি। নিয়ন্ত্রক সংস্থা যদি ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের পেছনে থাকে, তাহলেই তারা সব ভয়ভীতি উপেক্ষা করে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে।
ব্যাংকের সমস্যা ও সীমাবদ্ধতা দূর করার জন্য নিয়োগের আগে ব্যাংক কর্মকর্তাদের নির্দিষ্ট বিষয়ে ডিগ্রি অর্জন করে আসতে হয়। ব্যক্তিগতভাবে এ পদে বসার আগে আমাকেও নির্দিষ্ট কিছু পরীক্ষা উতরে আসতে হয়েছে।
ঘুরে-ফিরে কিছু ব্যক্তিই ব্যাংকিং খাতের শীর্ষ পদে থাকছেন। এক্ষেত্রে কি উপরের পর্যায়ে দক্ষ জনবল তৈরি হচ্ছে না?
সন্দেহ নেই, দক্ষ ও যোগ্য ব্যক্তির অভাব এক্ষেত্রে বড় কারণ হতে পারে। পাশাপাশি আমরা যারা শুরু থেকেই ব্যাংকিং খাতে আছি, অভিজ্ঞতা হেতু আমরা একেবারে সরে আসতে পারছি না। এক্ষেত্রে সরাসরি দায়িত্ব পালন শেষে নতুনদের দক্ষ করে তুলতে উপদেষ্টা হিসেবে আরো কিছুটা সময় থেকে যেতে হচ্ছে। আসলে যা-ই বলেন, অবসরে যাওয়ার পর কারো কি এমন দায়িত্ব নিতে ভালো লাগে? পরিস্থিতির দায়ে নতুন করে দায়িত্ব নিতে হয়, টাই বেঁধে স্যুট পরে গাড়ি নিয়ে এভাবে শেষ বয়সে এসেও কাজ করতে হচ্ছে নিয়ম মেনে। এক্ষেত্রে অনেক ক্ষেত্রে আমাদের অভিজ্ঞতাটাও সুখকর নয়। বিশেষ করে নতুন যিনি আসেন, তিনিও একজন ব্যবস্থাপনা পরিচালক। আমরা যারা পুরনো, তারাও ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলাম। অনেক ক্ষেত্রে নতুনদের সঙ্গে পুরনোদের মতের মিল নাও হতে পারে। এতে নানা সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করতে হবে। কিছুদিন আগে এজন্য একটি ভালো সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। সেখানে পূর্বতন পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে এসে নতুন করে কাজ করার বিষয়ে কিছু নীতি প্রণয়ন করা হয়েছে। বেসরকারি পর্যায়েও এমন সমস্যা উত্তরণে কাজ করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে বিআইবিএমের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোও অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখছে। অনেকে সেখানে ফ্যাকাল্টি হিসেবে শিক্ষাদান করছেন। ব্যাংকিং খাতের নানা সমস্যা, সীমাবদ্ধতা ও তা থেকে উত্তরণের বিষয়ে শিক্ষা দিচ্ছেন তারা। নতুনরা এখান থেকে উপকৃত হচ্ছেন। তবে এভাবে অবসর ভেঙে এমন শিক্ষা প্রদান আর কত দিন। নতুন করে কাজ করার ব্যাপারে এখনকার মহাব্যবস্থাপকদের অনুপ্রাণিত করতে হবে। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রযুক্তিগত সুবিধা ও আনুষঙ্গিকতা কাজে লাগিয়ে উন্নয়নের স্বপ্নযাত্রায় এগিয়ে যেতে হবে।
বিগত কয়েক বছরে ব্যাংকিং খাতে যে অপরাধগুলো সংঘটিত হয়েছে, সেগুলো কি রোধ করা যেত না?
নিত্যনতুন প্রযুক্তি আসছে। কিন্তু তার লাভ-ক্ষতি বিবেচনায় না নিয়ে সরাসরি অনুমোদনপ্রাপ্তি আখেরে ভালো ফল বয়ে আনছে না। এক্ষেত্রে ই-কমার্সের মতো বিভিন্ন পদ্ধতিগত দিক যাচাই-বাছাই না করায় ব্যাংকিং খাতের নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। বাইরের নানা দেশে ক্ষতি করে তারা এখন বাংলাদেশে হানা দিচ্ছে। এক্ষেত্রে আরেক সমস্যার নাম এটিএম কার্ড। বিদেশী কার্ড এনে আমাদের দেশের অর্থ লুটে নেয়া হচ্ছে। অর্থ যাচ্ছে আমাদের দেশের, লেনদেনের সুবিধা নিচ্ছে অন্য দেশ। এতে সমস্যা হওয়াটা নতুন কিছু নয়, বরং স্বাভাবিক। এক্ষেত্রে যে লোকসান হচ্ছে, আমরা সেটিকে বলি এক্সটার্নাল ফ্রড। এমন নানা সমস্যা সৃষ্টি করছে ব্যাংকের ভেতরে থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারীরাই। তবে তারা নানা দিক থেকে আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যাচ্ছে নিরাপদে। এদের হাত থেকে ব্যাংকিং খাতকে নিরাপদ করতে কমপ্লায়েন্সের বাস্তবায়ন প্রয়োজন। এক্ষেত্রে ব্যাংকিং খাতকে নিরাপদ করে তুলতে হলে উপযুক্ত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করাটাও জরুরি। এ নিয়ন্ত্রণ আর কিছুই নয়, সিস্টেমেটিক ফ্রড ম্যানেজমেন্ট। এক্ষেত্রে অনেক ধরনের দুর্নীতি ভেতর থেকে হচ্ছে বলে তা পর্দার আড়ালেই রয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন অ্যাকাউন্ট থেকে অবৈধ ট্রানজেকশন হচ্ছে। ভেতর থেকে কে বা কারা বলে দিচ্ছে ব্যালান্সশিটের অবস্থা। আর শেষ পর্যন্ত ঘটে যাওয়া দুর্নীতির নাগাল পাচ্ছে না সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থা। এক্ষেত্রে অপরাধের জন্য কেউ কেউ জেল খাটলেও নির্দেশদাতারা রয়ে যাচ্ছে আইনের আওতার বাইরে।
অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়া যায়?
ইন্টারনাল ফ্রড মূলত দুভাবে হচ্ছে। এক্ষেত্রে কেউ অর্থ সরিয়ে ফেলছে, কেউ কেউ দুর্নীতি গোপন করে অপরাধ ধামাচাপা দিচ্ছে। এক্ষেত্রে ব্যাংকের ফ্রড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম আরো শক্তিশালী করে তুলতে হবে, নইলে এখান থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন হবে।
ব্যাংকিং খাতে তদারকির বর্তমান অবস্থা কী?
তদারকি আছে, কিন্তু তা মানছে কে? এথিকস তথা নৈতিকতার প্রশ্নে অনেক পিছিয়ে রয়েছে এ খাত। নৈতিকতার চর্চা বাদে বর্তমান সমস্যা থেকে বের হয়ে আসা সম্ভব হবে না। সামাজিক ক্ষেত্রেও নৈতিকতার স্খলন যেমন ঘটেছে, তেমনি ব্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রেও ঘটেছে। ছোট্ট ছোট্ট কমার্শিয়াল কম্প্রোমাইজ করতে গিয়ে নৈতিকতার যে স্খলন ঘটেছে, তা অন্যান্য ক্ষেত্রেও থেকে যাচ্ছে। এখান থেকে বেরিয়ে আসতে না পারায় আরো বড় অপরাধ হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত পুরো ব্যাংক খাত ছেয়ে গেছে দুর্নীতিতে।
দুর্নীতি দমনে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকা কেমন?
রেগুলেটরি কমিশন হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক একটি কার্যকর ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশে এমন রেগুলেটরি প্রতিষ্ঠান আর নেই। আমি ৩২ বছর ব্যাংকিং করেছি। এর মধ্যে প্রায় আট-নয় বছর বিদেশে ছিলাম। এক্ষেত্রে নিজ দেশ ও বাংলাদেশের অভিজ্ঞতায় আমি বলব, বাংলাদেশ ব্যাংক একটি সুপ্রতিষ্ঠান। এক্ষেত্রে সুষ্ঠুভাবে কাজ করার জন্য তাদের স্বাধীনতা আরো বাড়ানো উচিত। আমরা কথায় কথায় অনেক ভালো পরামর্শ দিই। বাস্তবে এর প্রয়োগ নিশ্চিত করা গেলে অনেক সমস্যার সমাধান হবে।
শ্রুতিলিখন: মাহবুবুল হাসান
আলোকচিত্রী: জাহিদুল ইসলাম সজল

Discussion about this post