বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে প্রথমবারের মতো আজ শুরু হচ্ছে পাঁচ দিনব্যাপী ব্যাংকিং মেলা। মেলার প্রাক্কালে এর উদ্দেশ্য ও ব্যাংকিং খাতের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমান সাক্ষাত্কার নিয়েছেন সাকিব তনু
ব্যাংকিং মেলা আয়োজনের প্রয়োজন মনে করলেন কেন?
আসলে ব্যাংকিং খাতে নানা ধরনের সংস্কার, পরিবর্তন চলছে। প্রায় অর্ধযুগ ধরে ব্যাংকিং খাতকে একটি নতুন ধারায় পরিচালনার চেষ্টা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর মূল উদ্দেশ্য— উৎপাদকদের প্রতি নজর দেয়া। বিশেষ করে যারা নিচের দিকে আছেন— ক্ষুদ্র, মাঝারি, ছোট, তাদের দিকে নজর দেয়া। আমরা এ অভিযানের নাম দিয়েছি আর্থিক অন্তর্ভুক্তি। এতে নারী, কৃষকের ক্ষমতায়ন হচ্ছে। এ রকম নানা ক্ষেত্রে অর্থায়ন করছি। ব্যাংকগুলোকে আমরা এ রকম ছোট ছোট খাতে বিনিয়োগে অনুপ্রাণিত করছি।
এর অংশ হিসেবে প্রচুর ব্যাংকিং সেবাপণ্য তৈরি হয়েছে, বিশেষ করে ডিজিটাল সেবাপণ্য। কিন্তু আমরা এসব পণ্য সম্পর্কে ভোক্তাদের পুরোপুরি জানাতে পারিনি। সব ব্যাংকের সেবাপণ্য নিয়েই আমরা মেলায় একত্র হতে চাই।
মেলা সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, আমি একটা পণ্য নিয়ে যাব, অন্য পণ্য নিয়ে ফিরব। এখানে কেনাবেচা হবে না, তবে সবাই বিভিন্ন ব্যাংকের সেবাপণ্য সম্পর্কে সম্যক ধারণা পাবে। একটি ব্যাংক অন্য ব্যাংকের সেবাপণ্য সম্পর্কে জানবে, গ্রাহক চাহিদা বুঝতে পারবেন। এ যে মিলনমেলা। এ থেকে আমরা একে অন্যের কাছ থেকে শিখতে পারব। আর আমরা যে মানবিক ব্যাংকিং বলছি, মানুষ ছাড়া মানবিক ব্যাংকিং হয় কীভাবে! মানুষের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার একটা সুযোগ তৈরি করছি আমরা। ব্যাংকিং মেলার এটা প্রথম উদ্দেশ্য।
আরেকটি উদ্দেশ্য হলো, তরুণ প্রজন্মকে এর সঙ্গে যুক্ত করা। মেলায় বেশির ভাগ ব্যাংকের তরুণ কর্মীরা উপস্থিত থাকবেন। তরুণ প্রজন্ম নিজেদের ক্যারিয়ার গড়ার জন্য বিভিন্ন ব্যাংকের সেবাপণ্য সম্পর্কে ধারণা নেবে। একই সঙ্গে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ব্যাংকিং খাত সম্পর্কে জানবে। তারা এসব সেবাপণ্য নিয়ে আলোচনা করবে। তারাও তো এ খাতে আসবে একদিন। এছাড়া ফিন্যান্সিয়াল লিটারেসিকেও আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি।
স্কুল ব্যাংকিংকে গুরুত্ব দিচ্ছি। এটা এখন বিশ্বখ্যাত। যারা আগামী দিনের ব্যাংকার, তাদের কাছে আনতে চেষ্টা করছি। এছাড়া গ্রাহকদের নানা অভিযোগ থাকে, ব্যাংকে সেবা নিতে কী কী শর্ত পূরণ করতে হয়, এসব জানানো হবে। অনেক সময় গ্রাহকরা প্রাপ্য সম্পর্কে জানেন না, কমিশন কত, কেটে নিচ্ছে কত…। এজন্য গ্রাহকস্বার্থ সম্পর্কিত বিষয়টিও মাথায় রেখেছি। মেলায় গ্রাহকের কী কী প্রাপ্য, তা তুলে ধরা হবে। সবচেয়ে বড় কথা, সবাইকে নিয়ে আমরা ব্যাংকিং খাতকে অনেক দূর নিয়ে যেতে চাই। একে আরো শক্তিশালী, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অংশগ্রহণমূলক করতে চাই। অর্থনীতির হূদযন্ত্র কিন্তু ব্যাংকিং খাত, তাই একে সঙ্গে না নিয়ে অর্থনীতি এগোবে না। ব্যাংক কেবল ছোট প্রকল্পে অর্থায়ন করে না, বড় প্রকল্পগুলোয়ও করে। আমরা এ মেলায় ব্যাংকিং খাতের গুরুত্ব তুলে ধরার চেষ্টা করছি। কারো মধ্যে কোনো ভুল ধারণা থাকলে সেটাও দূর করার চেষ্টা করব। আমরা ব্যাংকিং খাতে ইতিবাচক প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি করতে চাই। এক ব্যাংক অন্য ব্যাংক থেকে শিক্ষা নিয়ে গ্রাহকসেবা বাড়াবে। এর সঙ্গে নির্মল আনন্দ, আনন্দের সঙ্গে শিক্ষা। গান-বাজনা হবে, আড্ডাবাজি চলবে, এভাবেই শিক্ষা নেবে। এভাবেই ব্যাংকিং খাতকে আমরা নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে চাই। আমার মনে হয়, বিশ্বের মধ্যে এটিই প্রথম এ-জাতীয় মেলা। কেন্দ্রীয় ব্যাংক যে এখন নিয়ন্ত্রণের চেয়ে অনেক বেশি উন্নয়নমুখী, মানুষমুখী, সেবাদানকারী— এসবই প্রমাণ হবে এ মেলা থেকে।
আমরা এসব তথ্য তুলে ধরলে বিশ্বব্যাপী নতুন ধারার কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিয়ে আলোচনা হবে। এরই মধ্যে আলোচনা হচ্ছে, এজন্য আমরা নানা পুরস্কারও পাচ্ছি। আমরা মেলা থেকে বার্তা দিতে চাই, ব্যাংক মানুষের জন্য। মানুষ ব্যাংকের কাছে যাবে না, ব্যাংকই যাবে মানুষের কাছে।
আর্থিক অন্তর্ভুক্তির এসব কার্যক্রম কি মুদ্রানীতিকে সমর্থন করে?
এটা মুদ্রানীতিরই অংশ। আমরা এখন যে মুদ্রানীতি প্রণয়ন করছি, তা টেকসই অর্থনীতিকে উৎসাহিত করার নীতি। পুরনো মুদ্রানীতির পয়েন্টগুলো আমরা বাদ দিচ্ছি না। মুদ্রা সরবরাহ, মূল্যস্ফীতি, মুদ্রার বিনিময় হার— এগুলোকে আমরা অবশ্যই নজরে রাখছি। পাশাপাশি যে টাকাটা দিচ্ছি, তা যেন উৎপাদনে যায়, তা নিশ্চিত করছি। আমাদের মুদ্রানীতি ভারসাম্যপূর্ণ, উৎপাদনশীল। বলা যায়, অর্থনীতি রিব্যালান্স করছি আমরা।
একটা সময় ছিল যখন ঋণ প্রবৃদ্ধি ২০ শতাংশ হয়েছিল, কিন্তু জিডিপি তো ৬ শতাংশেই ছিল। এখন ঋণ প্রবৃদ্ধি ১৩-১৪ শতাংশের পরও জিডিপি আগের চেয়ে বেশি। তার মানে আগের বেশকিছু অর্থ হয়তো উৎপাদনশীল খাতে ব্যয় হয়নি। এখন যা-ই ব্যয় হচ্ছে, সবই উৎপাদনশীল খাতে যাচ্ছে। এতে উৎপাদনের পাশাপাশি কর্মসংস্থানও বাড়ছে। আমরা যদি এখন ঋণ প্রবৃদ্ধি বাড়াতে পারি, তাহলে কর্মসংস্থানও বাড়বে, দারিদ্র্যও বিমোচন হবে। বিশ্বের সব দেশের মুদ্রানীতি কর্মসংস্থানের সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে আমাদের কর্মসংস্থানের তথ্য না থাকায় সেভাবে কাজ করতে পারছি না। এজন্য আমরা প্রবৃদ্ধি দিয়ে বিবেচনা করি। এখন টেকসই অর্থায়নের জন্য টেকসই মুদ্রানীতি করছি।
বাংলাদেশ ব্যাংক ছিটমহল নিয়েও কাজ করছে। একটা ডাটাবেজ তৈরির কাজ চলছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের রংপুর অফিস এটা তদারক করছে। ছিটমহলের সবাইকে আর্থিক সেবার আওতায় আনাই এর উদ্দেশ্য।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় আপনারা কী উদ্যোগ নিচ্ছেন?
আমরা সুশাসনে অনেক বেশি নজর দিয়েছি। সরকারি ব্যাংকগুলোয় পর্যবেক্ষক দেয়া হয়েছে। তারা পর্যবেক্ষণ করবেন, সহায়তা করবেন। ব্যাংকগুলোয় যেন নতুন করে রক্তক্ষরণ না হয়, ঋণ যাতে উৎপাদনশীল খাতের বাইরে অন্য কোথাও চলে না যায়, তারা সেদিকে দৃষ্টি রাখবেন। বিশেষ করে যাদের অর্থ পাওয়া উচিত, তারা না পেয়ে অন্যরা যেন না পায়, এসব দেখভাল করবেন পর্যবেক্ষকরা। তারা ভালো পরিবেশ তৈরি করবেন। বোর্ডে বসেই বলবেন, কোনটা আইনের মধ্যে পড়ে। আইন অনুযায়ী কাজ করার পরামর্শ দেবেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংক পর্ষদের কাছে কী আশা করে, পর্যবেক্ষকরা তা জানাবেন। তাদের এটা বোঝানোর চেষ্টা করা হবে। মূলত ব্যাংকিং নিয়মনীতির পরিপালন নিশ্চিত করার লক্ষ্যই পর্যবেক্ষক নিয়োগ। এটাকে হস্তক্ষেপ মনে করা ঠিক হবে না, রেটিং ভালো হয়ে গেলে পর্যবেক্ষক উঠিয়ে নেয়া হবে।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের এমডিদের বিরুদ্ধে কি কোনো পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে?
আমরাই সোনালী ও বেসিক ব্যাংকের এমডিকে সরিয়ে দিয়েছি। এ ক্ষমতা আমাদের দেয়া হয়েছে। নতুন করে প্রয়োজন পড়লেই এ ক্ষমতা প্রয়োগ করতে কোনো দ্বিধা করব না। তবে আমরা ধাপে ধাপে এমনটা করি। বেসিক ব্যাংকের ক্ষেত্রে প্রথমে পর্যবেক্ষক দিয়ে নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করেছিলাম, পরে এমডিকে সরিয়ে দিতে হয়েছে।
অনুমোদন পাওয়ার অল্প সময়েই নতুন ব্যাংকগুলো অনিয়মে জড়িয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ আসছে…
নতুন ব্যাংকগুলোর বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ চলছে। যারা বিশৃঙ্খল আচরণ করছে, তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হবে। যা-ই হোক, আমি একটা সুশৃঙ্খল ব্যাংকিং খাত চাই। সুশৃঙ্খল ব্যাংকিং খাত প্রতিষ্ঠায় কাজ করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

Discussion about this post