
সাকিব তনু
হলমার্ক কেলেঙ্কারি পুরো ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ পরিস্থিতিকেই উদ্বেগজনক করে তুলেছে। গত বছরের ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে বিতরণ করা মোট ঋণের ১০ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ, টাকার অঙ্কে যার পরিমাণ ৪২ হাজার ৭২৫ কোটি।
গত বছর খেলাপি ঋণ বেড়েছে অস্বাভাবিক হারে। ২০১২ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে নতুন করে খেলাপি ঋণ সৃষ্টি হয়েছে ২০ হাজার ৮১ কোটি টাকা। ২০১১ সাল শেষে দেশের ব্যাংক খাতে এ ঋণের পরিমাণ ছিল ২২ হাজার ৬৪৪ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৬ দশমিক ১২ শতাংশ।
খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সোনালী ব্যাংকের হলমার্ক কেলেঙ্কারি বড় ধরনের ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। রাষ্ট্রায়ত্ত এ ব্যাংক থেকে হলমার্কসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ৩ হাজার ৭০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা বের করে নেয়া হয়েছে ৩৫টি ব্যাংক থেকে, যার প্রায় পুরোটাই খেলাপি।
পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ২০ বছর ধরে খেলাপি ঋণ পরিস্থিতির যে উন্নতি হচ্ছিল পরপর দুই প্রান্তিকে তা আরো খারাপ হয়েছে। সামনে পরিস্থিতি আরো খারাপের দিকে যাবে— এটা অবশ্যম্ভাবী। কারণ ডেসটিনি, হলমার্ক, শেয়ারবাজারে যে কেলেঙ্কারি হয়েছে, তা ব্যাংকের প্রতিবেদনে এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে প্রতিফলিত হয়নি।
খেলাপি ঋণের অর্ধেক ২১ হাজার ৫১৫ কোটি টাকাই রাষ্ট্রায়ত্ত চার বাণিজ্যিক ব্যাংকের, যা তাদের বিতরণ করা মোট ঋণের ২৩ দশমিক ৮৭ শতাংশ। এর মধ্যে সোনালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ১২ হাজার ৪৫ কোটি টাকা, যা তাদের বিতরণকৃত ঋণের ৩৫ দশমিক ৪৮ শতাংশ। একইভাবে জনতা ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা (বিতরণকৃত ঋণের ১৩ দশমিক ৮০ শতাংশ), অগ্রণী ব্যাংকের ৪ হাজার ৬৬৩ কোটি টাকা (২৩ দশমিক ৬৭ শতাংশ) ও রূপালী ব্যাংকের ৯৬৯ কোটি টাকা (১১ দশমিক ১৭ শতাংশ)।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর এস কে সুর চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, মূলত হলমার্কের ঘটনার কারণে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে গেছে। নতুন নীতিমালা প্রয়োগের কারণেও তা কিছুটা বাড়তে পারে। তবে এ নীতিমালার মাধ্যমে দেশের ব্যাংক খাত আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত হয়েছে। ঋণ শৃঙ্খলা বিধানে ব্যাংকগুলোর তদারকি আরো জোরদার করা হয়েছে।
বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর মধ্যে খেলাপি ঋণ সবচেয়ে বেশি বেড়েছে যমুনা ব্যাংকের, ৫ দশমিক ৮২ শতাংশ। ২০১২ সালের ডিসেম্বর শেষে এ ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৯৯ কোটি টাকা। বেসরকারি অন্যান্য ব্যাংকের মধ্যে দ্য সিটি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৪ দশমিক ১২ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ৬০৭ কোটি, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের ৩ দশমিক ৯৪ শতাংশ বেড়ে ১৫৫ কোটি, উত্তরা ব্যাংকের ৩ দশমিক ৮৯ শতাংশ বেড়ে ৫১৪ কোটি ও ব্যাংক এশিয়ার ২ দশমিক ৯৯ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ৫২৫ কোটি টাকা।
এ সময়ে পূবালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ২ দশমিক ৯৭ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ৬০৩ কোটি টাকা। ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক হেলাল আহমেদ চৌধুরী এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘বড় দু-তিনটি ভোগপণ্য ব্যবসায়ী খেলাপি হয়ে যাওয়ায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। আমরা অনেক বেশি সতর্কতা অবলম্বন করছি। আশা করছি, চলতি প্রান্তিকেই নিয়ম মেনে পুনঃতফশিল করে আমরা আগের অবস্থানে চলে আসতে পারব।’
এছাড়া ঢাকা ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ২ দশমিক ৮৪ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ৫৬৫ কোটি, এনসিসি ব্যাংকের ২ দশমিক ৮৩ শতাংশ বেড়ে ৪৩৭ কোটি ও এক্সিম ব্যাংকের ২ দশমিক ৬৮ শতাংশ বেড়ে ৫০৫ কোটি টাকা। এক্সিম ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হায়দার আলী এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘নতুন নীতিমালা প্রয়োগ করার কারণেই আমাদের খেলাপি ঋণ বেড়েছে।’
একই সময়ে ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২ দশমিক শূন্য ২, ব্র্যাক ব্যাংকের ১ দশমিক ৬, মিউচুয়াল ট্রাস্টের ১ দশমিক শূন্য ৫, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের ১ দশমিক শূন্য ৫, ট্রাস্ট ব্যাংকের ১ দশমিক ৫৭, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের দশমিক ৩২, প্রিমিয়ার ব্যাংকের ১ দশমিক ১৬, ওয়ান ব্যাংকের ১ দশমিক শূন্য ৪, মার্কেন্টাইল ব্যাংকের ১ দশমিক ৮৪, ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের দশমিক ১৫, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের দশমিক ৬৯, সাউথইস্ট ব্যাংকের ১ দশমিক শূন্য ১, প্রাইম ব্যাংকের ১ দশমিক ৫৬, ইস্টার্ন ব্যাংকের ১ দশমিক ৪৬, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের ১ দশমিক ৯৪, ন্যাশনাল ব্যাংকের ১ দশমিক ৪৮, আইএফআইসির ১ দশমিক ৩১ ও এবি ব্যাংকের দশমিক ২৬ শতাংশ।
২০১২ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে যথাক্রমে ১ হাজার ৩৮২ কোটি, ৭৬৩ কোটি, ২০২ কোটি, ২৮৪ কোটি, ২৫০ কোটি, ১৫৩ কোটি, ২৮১ কোটি, ৩৩২ কোটি, ৪০৯ কোটি, ২৬৬ কোটি, ১৭৮ কোটি, ৫৬৮ কোটি, ৪৬০ কোটি, ৩০৭ কোটি, ৫০১ কোটি, ৫৪৪ কোটি, ৪০৯ কোটি ও ৩২৫ কোটি টাকা।
অন্যদিকে সোস্যাল ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ দশমিক ৪২ শতাংশ কমে হয়েছে ২৫৩ কোটি টাকা। আর দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ কমে ফার্স্ট সিকিউরিটি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ১৭৮ কোটি টাকা।
Discussion about this post