খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ সোনালী ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক ও বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে অধিষ্ঠিত থাকার পর বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর হয়েছিলেন। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যানও ছিলেন। ২০১০ সালে শেয়ারবাজারের পতনের কারণ অনুসন্ধানে তাঁর নেতৃত্বে গঠিত কমিটির প্রতিবেদন ব্যাপক আলোচিত হয়। সাম্প্রতিক শেয়ারবাজার পরিস্থিতি, ব্যাংকের সুশাসন, আমানতের সুদ হার ও রিজার্ভ চুরি ইস্যুতে কথা বলেছেন প্রথম আলোর সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সানাউল্লাহ সাকিব
প্রথম আলো: শেয়ারবাজারে সাম্প্রতিক উত্থান-পতনকে কীভাবে দেখছেন। এটা স্বাভাবিক ছিল?
খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ: এটা কোনো স্বাভাবিক উত্থান বা পতন ছিল না। শেয়ারবাজারে ভেতরের একটি অংশ আবারও একটি বিপর্যয় ঘটানোর চেষ্টা করেছিল। তবে অনেক হইচই পড়াতে তারা সফল হয়নি, দাম সংশোধন হয়েছে। এ রকম না হওয়াই ভালো। শেয়ারবাজারে ওঠানামা করবে এটা স্বাভাবিক। তবে অস্বাভাবিক ওঠানামা করবে এটা কাম্য নয়।
প্রথম আলো: শেয়ারবাজারে ব্যাংকের বিনিয়োগ নিয়ে অনেক আলোচনা হয়। ব্যাংকগুলোর কি ভূমিকা থাকা উচিত?
ইব্রাহিম খালেদ: ব্যাংক কোম্পানি আইনে সুস্পষ্ট বলা হয়েছে, পরিশোধিত মূলধনের ২৫ শতাংশের বেশি বিনিয়োগ করা যাবে না। এ নিয়মের ব্যত্যয় হওয়াতেই ২০১০ সালে বড় বিপর্যয় হয়েছিল। এ জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংককে সতর্ক থাকতে হবে। জনগণের আমানতের কোনো অর্থই শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করা যাবে না।
প্রথম আলো: আপনার তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশ তো সেভাবে বাস্তবায়ন হয়নি। এখনো কি শেয়ারবাজারে কোনো দুষ্টচক্র রয়ে গেছে?
ইব্রাহিম খালেদ: সরকার কোনো তদন্ত প্রতিবেদনেই মনোযোগ দিয়ে বাস্তবায়ন করে না। আমাদের ক্ষেত্রেও তা–ই হয়েছে। ডিমিউচুয়ালাইজেশন আমাদের সুপারিশ ছিল, তবে যেটা করা হয়েছে এটা আংশিক। যারা শেয়ারবাজারে খেলোয়াড়, তাদের থেকে প্রশাসন পুরো আলাদা থাকার কথা বলা হয়েছিল। এখন দেখা যাচ্ছে স্টক এক্সচেঞ্জে পর্ষদের ৪০ শতাংশই শেয়ারবাজারের খেলোয়াড়। ফলে তারা অনেক বেশি প্রভাব বিস্তার করছে। এ ছাড়া দুই-পাঁচ বছর পর্যন্ত স্টক এক্সচেঞ্জে নতুন সদস্য সংগ্রহ বন্ধ রাখা হয়েছে। এতে স্টক এক্সচেঞ্জ পরিচালনায় পুরোনো খেলোয়াড়েরাই বেশি ভূমিকা রাখছে। নতুন সদস্যের বিষয়টি উন্মুক্ত করে দেওয়া উচিত। এতে প্রতিযোগিতা বাড়বে।
প্রথম আলো: ব্যাংকে সুশাসনের বিষয়টি সব সময় আলোচিত। সরকারি ব্যাংকের পাশাপাশি বেসরকারি ব্যাংকের অনিয়ম হচ্ছে। ঠেকানো যাচ্ছে না কেন?
ইব্রাহিম খালেদ: সরকারি ব্যাংকে গড় খেলাপি ঋণের হার ২৫ শতাংশ, বেসরকারি ব্যাংকে ৫ শতাংশ। সরকারি ব্যাংকগুলোকে নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংককে পুরো আইনি ক্ষমতা প্রয়োগ করতে দেওয়া হয়নি। সরকার মনোনীত পরিচালকদের বাংলাদেশ ব্যাংক অপসারণ করতে পারে না। এটা একটি কালো আইন। সব ব্যাংকই তো সমান। এ কারণেই এসব ব্যাংকে দুর্নীতি রয়ে গেছে। এটা দ্রুত সংশোধন প্রয়োজন। এ ছাড়া অর্থ মন্ত্রণালয়ে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ খোলার কারণেও দুর্নীতি বাড়ছে। আগে যখন অর্থসচিব সরকারি ব্যাংকের পরিচালক নিয়োগ করতেন, তখন তুলনামূলক ভালো নিয়োগ ছিল। মূলত জ্যেষ্ঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা অর্থ মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবে নিয়োগ পান। যখন থেকে ব্যাংকিং বিভাগের সচিব সরকারি ব্যাংকের পরিচালক নিয়োগ দিতে শুরু করলেন, তখন থেকে ব্যাংকগুলোতে অনিয়ম-দুর্নীতি বাড়তে থাকল। ব্যাংকিং বিভাগের সচিব কনিষ্ঠ হওয়ার সুযোগে শক্তিশালী মহল যে কাউকে পরিচালক নিয়োগ দিচ্ছে। আমার সুপারিশ ব্যাংকিং বিভাগ তুলে দিয়ে দায়িত্বটি অর্থসচিবের কাছে ন্যস্ত করা। এ ছাড়া চার-পাঁচটি বেসরকারি ব্যাংকে বেশ কিছু দুর্ঘটনার খবর পাওয়া যাচ্ছে। এসব রোধে বাংলাদেশ ব্যাংককে সজাগ হতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংককে এ ক্ষেত্রে ক্ষমতা প্রয়োগ করতে হবে। শক্ত ব্যবস্থা না নেওয়ায় এসব ঘটছে।
প্রথম আলো: নতুন ব্যাংক অনুমোদন দেওয়া হলো। এসব ব্যাংকেও তো অনিয়ম হচ্ছে। আরও নতুন ব্যাংক দেওয়ার আলোচনা চলছে। বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?
ইব্রাহিম খালেদ: বাংলাদেশের সীমিত অর্থনীতিতে নতুন ব্যাংকের প্রয়োজন ছিল না। প্রবাসীদের ভূমিকার কারণে তিনটি ব্যাংক দেওয়া হলো। সরকারের ইচ্ছার ভিত্তিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন দিল। আরও বেশ কয়েকটি ব্যাংক দেওয়া হলো, যার অনুমোদন না দিলেও চলত। বর্তমান বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে এসব ব্যাংক সঠিকভাবে পরিচালনা করতে বাংলাদেশ ব্যাংককে কঠোর হতে হবে। পর্যবেক্ষক নিয়োগ দিয়ে ব্যাংকগুলোকে ভালো করা যাবে না। ঘন ঘন তদন্ত করে প্রতিবেদনের ভিত্তিতে অপরাধীকে শাস্তি দিতে হবে। পর্ষদ বা এমডি যে কারও বিরুদ্ধে অনিয়ম পাওয়া গেলে বরখাস্ত করতে হবে। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ৫৭ ব্যাংক যথেষ্ট। নতুন করে আরও ব্যাংক দিলে অস্থিরতা সৃষ্টি হতে পারে। এ জন্য বাংলাদেশ ব্যাংককে কঠোর হতে হবে।
প্রথম আলো: আমানতের সুদের হার ৫ শতাংশে নেমে এসেছে, যা মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম। কোথায় যাবেন সাধারণ আমানতকারীরা?
ইব্রাহিম খালেদ: অর্থনীতির নিয়ম অনুযায়ী মূল্যস্ফীতির চেয়ে আমানতের সুদের হার বেশি থাকা উচিত। না হলে সাধারণ আমানতকারীরা বিপাকে পড়েন। এখন ঠিক তা–ই হয়েছে। ব্যাংকগুলোকে সঞ্চয়ের ওপর সুদের হার বাড়ানোর ব্যবস্থা করতে হবে। এ জন্য ব্যাংকের খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনতে হবে। খেলাপি ঋণের ধাক্কা সামলে ব্যাংকের পক্ষে ওপরে ওঠা সহজ হচ্ছে না। এ ছাড়া ঋণ ও আমানতের সুদের হারের ব্যবধান ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৪ শতাংশে আনতে হবে। এত ব্যবধান বাংলাদেশে ব্যাংকগুলোর অদক্ষতার পরিচয়। বিদেশে এর হার ২-৩ ভাগের মধ্যে।
প্রথম আলো: বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনার ১ বছর পেরিয়ে গেল। অর্থও সেভাবে ফেরত এল না, বিচারও হলো না।
ইব্রাহিম খালেদ: রিজার্ভ চুরির ঘটনায় গভর্নরের পদত্যাগ, ডেপুটি গভর্নরদের অপসারণে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কিছু ভূমিকা ছিল। চুরির পর বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকায় কিছু টাকা ফেরত এসেছে, সে দেশের সিনেটে শুনানি হয়েছে। কিন্তু অর্থ মন্ত্রণালয় দায়িত্ব নিয়ে অনেক কিছু করল, কিন্তু কোনো কাজে এল না। এ ছাড়া ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট পরিবর্তনের পর তাদের অসহযোগিতা শুরু হলো। বাংলাদেশের তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করার সময় দিয়েও অর্থমন্ত্রী প্রকাশ করলেন না। এ কারণে ফিলিপাইনও গড়িমসি শুরু করল। এখন আর আলোচনা করে টাকা ফেরত আনা যাবে না। এ জন্য মামলা করে অর্থ ফেরত আনার ব্যবস্থা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে চার-পাঁচ বছর লেগে যাবে। এ জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়কে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে। তবে তারা পূর্ণ সক্রিয় হতে পারবে কিনা, আমার সন্দেহ রয়েছে।
১১/২/২০১৭


Discussion about this post