বেসরকারি খাতের ইস্টার্ণ ব্যাংক ২৫ বছর পূর্ণ করতে যাচ্ছে। দেশে অনেক বেসরকারি ব্যাংক রয়েছে। এর মধ্যে যারা সুনাম অর্জন করেছে তাদের মধ্যে এ ব্যাংকটি রয়েছে। নতুন সেবাপণ্য ও কার্ড ব্যবসায়ও এগিয়ে তারা। ইস্টার্ণ ব্যাংক ও ব্যাংক খাতের সামগ্রিক অবস্থা নিয়ে প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আলী রেজা ইফতেখার। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সানাউল্লাহ সাকিব
প্রথম আলো: ঋণের সুদের সঙ্গে আমানতের সুদ হারও কমে গেছে। সে তুলনায় বিনিয়োগ কতটা বাড়ল?
আলী রেজা ইফতেখার: যারা বলে সুদ হারের কারণে বিনিয়োগ হচ্ছে না, এটা সম্পূর্ণ ভুল। হ্যাঁ সুদ হার একটা উপাদান, তবে এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি। তার কি কোনো সুরাহা হয়েছে? সুদের ওপর নির্ভর করে যারা দিন যাপন করে তাদের আয় ৬০-৭০ শতাংশ কমে গেছে। তাদের অবস্থা খুবই খারাপ। এ জন্য সবাই সঞ্চয়পত্রের দিকে যাচ্ছে। এটা সরকারের একটা ব্যয়বহুল খাত। এখন কিন্তু ঋণের সুদ হার আর কমবে না, বরং ধীরে ধারে বাড়বে। মূল্যস্ফীতি বাড়লে আমানতের সুদ হার বাড়বে। এতে ঋণের সুদ হারও একটু বাড়বে।
প্রথম আলো: ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ প্রতিনিয়ত বাড়ছে, কারণটা কী?
ইফতেখার: খেলাপি ঋণ বাড়ার প্রধান কারণ জামানতনির্ভর ঋণ দেওয়া। ঋণ দেওয়ার এই পদ্ধতি ভুল। কারণ সম্পত্তি থেকে তো কোনো অর্থ আসে না, ছোট চালু কারখানা থাকলেও সেটার নগদ অর্থের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া উচিত। বাংলাদেশের এখনো অনেক ব্যাংক জামানতনির্ভর ঋণ দিচ্ছে, এ কারণে খেলাপি ঋণ বাড়ছে। কারণ সম্পত্তি বিক্রি করে তো ঋণ আদায় করা যায় না। ব্যবসা থেকে কী পরিমাণ টাকা আসবে, তা দেখেই ঋণ দিতে হবে। এ ছাড়া যাঁরা ঋণ মূল্যায়ন, ঝুঁকি মূল্যায়ন করেন তাঁদের অনেকেই তা ঠিকমতো করতে পারেন না। এখন মূল্যায়নের কৌশল পাল্টে গেছে। যথাযথ প্রশিক্ষণ পেলেই সঠিক মূল্যায়ন হবে। তদারকি ও আইনি ব্যবস্থার ধীরগতির কারণেও খেলাপি বাড়ছে। জামানতকে ভিত্তি ধরে ঋণ দেওয়া বন্ধ করে দিতে হবে। ব্যবসায়ীকে কোনো ঋণ দেওয়া যাবে না, ব্যবসাকে ঋণ দিতে হবে। তাহলেই খেলাপি ঋণ কমে আসবে।
প্রথম আলো: ব্যাংকগুলোর অনিয়ম ঠেকাতে পর্যবেক্ষক নিয়োগ দিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে দুটি নতুন ব্যাংকও আছে। এরপরও অনিয়ম বন্ধ হচ্ছে না।
ইফতেখার: নতুন ব্যাংকগুলোর অনুমোদন না দিলেই ভালো হতো। আর্থিক খাতে এসব ব্যাংকের কোনো চাহিদা ছিল না। বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোকে এখন একীভূত বা অধিগ্রহণ করার সময় এসেছে। বড় ব্যাংকগুলোর সঙ্গে ছোট ব্যাংকগুলোর একীভূত করে দেওয়া উচিত। কারণ সব ব্যাংকেই জনগণের টাকা রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত হবে, ব্যাংকগুলোকে লক্ষ্য নির্ধারণ করে দেওয়া। লক্ষ্য পূরণ করতে না পারলেই একীভূত করে দিতে হবে।
প্রথম আলো: ১৫ হাজার কোটি টাকার ঋণ পুনর্গঠন করা হয়েছিল। এসব ঋণ আবারও খেলাপি হয়ে পড়ছে। উদ্যোগটা কি যথাযথ ছিল?
ইফতেখার: ব্যাংক খাত চালাতে ঋণ পুনর্গঠন থাকতেই পারে। বিষয় হলো কাদের জন্য এ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে, নীতিমালায় কী আছে। যদি ১ শতাংশ ডাউনপেমেন্ট নিয়ে ঋণ পুনর্গঠন করা হয়, তার তো কোনো মানে হয় না। বিদেশে টাকা পাচার করে, এমন কারও ঋণ পুনর্গঠন করা হলে তো তিনি টাকা ফেরত দিতে পারবেন না। যারা ঋণ নিয়ে অপব্যবহার করেছে, সে কখনোই টাকা ফেরত দিতে পারবে না।
প্রথম আলো: কয়েকটি ব্যাংক ভালো করছে। বেশির ভাগই তো খারাপের দিকে।
ইফতেখার: ব্যাংকগুলো খারাপ হওয়ার জন্য পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কমিটি দুটোই সমানভাবে দায়ী। ব্যবস্থাপনা কমিটির ব্যর্থতা তারা ভালোভাবে ব্যাংক চালাতে পারছে না। পারবে কীভাবে, এমডি হওয়ার যোগ্যতা যদি ১৫ বছর চাকরি হয়। এটা কোনো যোগ্যতা হলো! প্রশাসন বিভাগে কাজ করেও অনেকে এমডি হয়ে যাচ্ছেন। তিনি এমডি হয়ে কী করবেন, কিছু বুঝবেন? এ যোগ্যতা এখনই পুনর্নির্ধারণ করতে হবে। ব্যাংকের যে শীর্ষ ব্যবস্থাপনা কমিটি আছে তাদের সবাইকে পেশাদার হতে হবে। অনেক ব্যাংকের চেয়ারম্যান তো প্রতিদিন অফিস করছেন, তাহলে সেখানে এমডি রাখা হয়েছে কেন? দুটি কমিটির কাজ ভিন্ন। এটা মনে রেখে যেসব ব্যাংক চলবে তারাই ভালো করবে।
প্রথম আলো: ব্যাংক কোম্পানি আইন পরিবর্তন হচ্ছে। এতে কি সুবিধা হবে, না আরও খারাপ হবে পরিস্থিতি?
ইফতেখার: পরিচালকদের ৯ বছর মেয়াদ হতেই পারে, যাঁরা ব্যাংকের উদ্যোক্তা তাঁরা সুযোগ চাইবেন, এটাই স্বাভাবিক। তবে এক পরিবার থেকে চারজন রাখার বিষয়টি বেশি হয়ে গেছে। এটা না করলেও হতো।
প্রথম আলো: ২৫ বছর পূর্ণ করতে যাচ্ছে ইস্টার্ণ ব্যাংক। ব্যাংকিং ব্যবসায় কেমন চলছে?
ইফতেখার: চলতি সপ্তাহেই ২৫ বছর পূর্তি করব আমরা। আগে বিসিসিআই ব্যাংক নামে পরিচিতি ছিল। পরে সরকারের একটি প্রকল্পের অধীনে এটি ইস্টার্ণ ব্যাংক নামে চালু হয়। ২০০২ সালেই আমরা পূর্ণাঙ্গ প্রযুক্তিনির্ভর সেবা চালু করি। এখনো দেশের অনেক ব্যাংক তা পারেনি। আমরা সব ব্যবসায় যাইনি, যেসব ব্যবসায় দক্ষতা আছে শুধু সেদিকেই ঝুঁকেছি। আমাদের শাখা মাত্র ৮২, যাদের দুই শ থেকে আড়াই শ শাখা আছে তারাও আমাদের ধারেকাছে নেই। শাখা বাড়াতে হবে, এ ধারা আমরা বিশ্বাস করিনি। সবকিছুই নির্ভর করে দক্ষতার ওপর। গত বছর আমরা ১ হাজার ৬০০ কর্মকর্তার জন্য সাড়ে ৫ হাজার প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠান করেছি। হংকংয়ে আমাদের ব্যবসা আছে, যে পরিমাণ বিনিয়োগ করা হয়েছিল তার ৬-৭ গুণ মুনাফা দেশে আনা হয়েছে। চীনের গুয়াংজুতে একটি শাখা খোলার অনুমোদন পেয়েছি। আগামী বছর ভারতে একটা পূর্ণাঙ্গ শাখা খুলতে চাই। শ্রীলঙ্কায়ও শাখা খোলার ইচ্ছা আছে। অর্থাৎ দেশ থেকে বের হয়ে আঞ্চলিক ব্যাংক হতে চায় ইস্টার্ণ। আমাদের অন্য সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোও অনেক ভালো করছে। ব্যাংকের আয়কে বিকেন্দ্রীকরণ করেছি। ফলে কোনো প্রতিষ্ঠান খারাপ করলেও আর্থিক সূচক খারাপ হবে না। বাংলাদেশের খেলাপি ঋণ অনেক বেশি, বাড়ছে। কিন্তু আমাদের খেলাপি ঋণ কমছে।
প্রথম আলো: ঋণের চাহিদা এখন কেমন?
ইফতেখার: আমাদের ঋণের বড় অংশই করপোরেট। তবে রিটেইল অনেক ভালো করছে। রিটেইল ব্র্যান্ডিংয়ে দেশের মধ্যে আমরাই শীর্ষে। আমাদের কার্ড, ব্র্যান্ডিং, লাউঞ্জ সেবা অন্য ব্যাংক থেকে আলাদা। আমাদের শাহজালাল এয়ারপোর্টের লাউঞ্জেই গত বছর ৮২ হাজার যাত্রী এসেছিল।
আমরা এখন উৎপাদন বা ম্যানুফ্যাকচারিং দিকেই বেশি ঝুঁকছি। একসময় বাণিজ্য বা ট্রেডিংয়ে ঋণ বেশি ছিল। পোশাক খাত, ওষুধশিল্প, জ্বালানি, ইস্পাত, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, চামড়ায় ঋণ যাচ্ছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারিশিল্প বা এসএমইতেও ভালো ঋণ যাচ্ছে। জ্বালানি খাতের ঋণের চাহিদা আছে। সিন্ডিকেশন, ক্লাব ফাইন্যান্সিং ছাড়া এসব বড় ঋণ সম্ভব না। যদি সরকার সার্বভৌম গ্যারান্টি দেয়, তাহলে ব্যাংকগুলো ঋণ দিতে আগ্রহ পাবে।


Discussion about this post