ব্যাংকিং খাতে সম্পদের বিপরীতে আয় (রিটার্ন অন অ্যাসেট) ও শেয়ারহোল্ডারদের মালিকানার বিপরীতে আয় (রিটার্ন অন ইকুইটি) দুটোই নিম্নমুখী। বিপরীতে বেড়েছে মূলধনের অনুপাতে খেলাপি ঋণ। এ তিন সূচকের নিম্নমুখিতা খাতটিতে দক্ষতা কমার ইঙ্গিত দিচ্ছে। সেই সঙ্গে দুর্বল হচ্ছে বড় ব্যাংকগুলো; যা ভাবিয়ে তুলছে এ খাতের উদ্যোক্তাদের।
সম্পদের বিপরীতে কী পরিমাণ মুনাফা আসে, তার ধারণা পাওয়া যায় রিটার্ন অন অ্যাসেট থেকে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০১০ সালে ব্যাংকিং খাতে সম্পদ থেকে আয় ছিল ১ দশমিক ৭ শতাংশ। ২০১৪ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে দশমিক ৭ শতাংশে। তার আগের বছর অর্থাৎ ২০১৩ সালে রিটার্ন অন অ্যাসেট ছিল দশমিক ৯ শতাংশ।
ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডাররা কী পরিমাণ মুনাফা পাচ্ছেন, তার হিসাব পাওয়া যায় রিটার্ন অন ইকুইটি থেকে। ২০১০ সালে ইকুইটি থেকে আয় ছিল ১৯ দশমিক ৯ শতাংশ। ২০১৪ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ১ শতাংশে। ২০১৩ সালেও এটা ছিল ১০ দশমিক ৭ শতাংশ। অর্থাৎ সম্পদ ও বিনিয়োগ থেকে আয় উভয় সূচকেই খাতটির অবনতি হয়েছে।
এছাড়া ব্যাংকে পরিচালক ও শেয়ারহোল্ডারদের যে মূলধন রয়েছে, ২০১৪ সাল শেষে তার ৬৮ শতাংশই খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। যদিও ২০১৩ সাল শেষে মূলধনের ৬০ শতাংশ ছিল খেলাপি। আর ২০১২ সালে তা ছিল ৭৪ শতাংশ। ব্যাংকে পরিচালক ও শেয়ারহোল্ডারদের মূলধনের সঙ্গে খেলাপি ঋণের তুলনা করে এ হিসাব করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর এসকে সুর চৌধুরী এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, মূলত খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে এসব সূচকে। খেলাপি ঋণ বাড়ায় সঞ্চিতি সংরক্ষণ করতে হয়েছে। ফলে মুনাফাও কমে গেছে। সবার আয়েই এর প্রভাব পড়েছে। তবে বর্তমানে যে অবস্থা, তাতে চলতি বছর পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটবে। মুনাফা বাড়বে, ফলে সূচকেরও উন্নতি হবে।
মূলধন খেলাপি হয়ে যাওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ব্যাংক তো মূলধনের ওপর চলে না। ব্যবসার জন্য গ্রাহকের আমানতই ব্যাংকের মূল ভরসা। তবে ব্যাংকগুলোকে মূলধনভিত্তি আরো শক্তিশালী করতে বলা হয়েছে। ২ শতাংশ বেশি মূলধন সংরক্ষণ করেছে ব্যাংকগুলো। মূলধনের বড় অংশই খেলাপি, এটা আশঙ্কাজনক নয়। তবে ১০ শতাংশ খেলাপি ঋণ আমাদের জন্য স্বস্তিদায়কও নয়। খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনতে কাজ চলছে। সামনেই সূচকের উন্নতি ঘটবে।
বিনিয়োগের দিক দিয়ে দেশের সবচেয়ে বড় ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড। গত পাঁচ বছরে সম্পদ থেকে মুনাফা ধারাবাহিকভাবে কমেছে বেসরকারি খাতের ব্যাংকটির। ২০১০ সালে ইসলামী ব্যাংকের সম্পদ থেকে আয় ছিল ১ দশমিক ৪৭ শতাংশ। ২০১৪ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে দশমিক ৬৭ শতাংশে। এর আগে ২০১১ সালে ব্যাংকটির রিটার্ন অন অ্যাসেট ছিল ১ দশমিক ৩৫, ২০১২ সালে ১ দশমিক ২৭ ও ২০১৩ সালে দশমিক ৯৬ শতাংশ।
শেয়ারহোল্ডারদের বিনিয়োগ থেকেও মুনাফার ধারাবাহিক পতন হয়েছে ইসলামী ব্যাংকের। ২০১০ সালে ব্যাংকটির রিটার্ন অন ইকুইটি ছিল ১৯ শতাংশ। ২০১৪ সালে তা নেমে আসে ৯ শতাংশে। এছাড়া ২০১১ সালে ব্যাংকটির রিটার্ন অন ইকুইটি ছিল ১৭ শতাংশ, ২০১২ সালে ১৩ ও ২০১৩ সালে ১১ শতাংশ।
বিনিয়োগের দিক দিয়ে দেশের দ্বিতীয় বৃহৎ ব্যাংক জনতা। রাষ্ট্রায়ত্ত এ ব্যাংকেরও সম্পদ ও বিনিয়োগ থেকে আয় কমেছে। ২০১৩ সালে ব্যাংকটির সম্পদ থেকে আয় ছিল ১ দশমিক ৩৩ ও বিনিয়োগ থেকে ২০ দশমিক ২৭ শতাংশ। ২০১৪ সালে দুই সূচকেই পিছিয়েছে ব্যাংকটি। এ সময় রিটার্ন অন অ্যাসেট ও রিটার্ন অন ইকুইটি কমে দাঁড়িয়েছে যথাক্রমে দশমিক ৬৬ ও ১০ দশমিক ৬৪ শতাংশে।
বড় ধরনের ঋণ অনিয়মের ঘটনায় সংকটময় সময় পার করছে রাষ্ট্রায়ত্ত বেসিক ব্যাংক। তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০১৩ সালে ব্যাংকটির সম্পদ ও বিনিয়োগ থেকে আয় ছিল যথাক্রমে ঋণাত্মক দশমিক ৩২ ও ঋণাত্মক ৯ দশমিক ৫৬ শতাংশ। ২০১৪ সালেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। বরং আরো খারাপ হয়েছে। ২০১৪ সালে ব্যাংকটির রিটার্ন অন অ্যাসেট ও রিটার্ন অন ইকুইটি দাঁড়িয়েছে যথাক্রমে ঋণাত্মক ১৫ দশমিক ৭ ও ঋণাত্মক ২০৬ শতাংশে।
রিটার্ন অন অ্যাসেট ও রিটার্ন অন ইকুইটি দুই সূচকেই আগের চেয়ে খারাপ করেছে বেসরকারি খাতের এবি ব্যাংক। ২০১৩ সালে ব্যাংকটির সম্পদ ও বিনিয়োগ থেকে আয় ছিল যথাক্রমে ১ দশমিক ৩৫ ও ১৩ দশমিক ৪৮ শতাংশ। ২০১৪ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে দশমিক ৫৯ ও ৬ দশমিক ৪৪ শতাংশ।
বেসরকারি খাতের আরেক ব্যাংক ডাচ্-বাংলার সূচকও নিম্নমুখী। ২০১৩ সালে ব্যাংকটির সম্পদ ও বিনিয়োগ থেকে আয় ছিল যথাক্রমে ১ দশমিক শূন্য ৮ ও ১৩ শতাংশ। ২০১৪ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক শূন্য ২ ও ১২ দশমিক ৯২ শতাংশ।
পরিস্থিতি ভিন্ন নয় বেসরকারি খাতের প্রাইম ব্যাংকেরও। ২০১৩ সালে ব্যাংকটির সম্পদ ও বিনিয়োগ থেকে আয় ছিল যথাক্রমে ১ দশমিক ৪৮ ও ১৫ দশমিক ১১ শতাংশ। গত বছর তা কমে দাঁড়িয়েছে দশমিক ৯৬ ও ৯ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ।
বেসরকারি খাতের ব্যাংক আল-আরাফাহ্। ২০১৩ সালে ব্যাংকটির সম্পদ ও বিনিয়োগ থেকে আয় ছিল যথাক্রমে ১ দশমিক ২ ও ১৩ দশমিক ৬২ শতাংশ। পরের বছর তাতে অবনতি ঘটে। ২০১৪ সালে ব্যাংকটির রিটার্ন অন অ্যাসেট ও রিটার্ন অন ইকুইটি কমে হয়েছে যথাক্রমে ১ দশমিক শূন্য ৩ ও ১২ দশমিক ৩২ শতাংশ।
ব্যাংক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার এ প্রসঙ্গে বলেন, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বিভিন্ন অনিয়মের কারণে ব্যাংকগুলো ভালো ব্যবসা করতে পারেনি; যার প্রভাব পড়েছে সার্বিক সূচকে। পরিস্থিতির উন্নতি ঘটতে ব্যাংকগুলোর আরো সময়ের প্রয়োজন হবে। কারণ বড় গ্রহীতারা অনেকেই গত কয়েক বছরে ভালো ব্যবসা করতে পারেননি। ফলে অনেকেই ঋণ পুনর্গঠন করছেন। এসব ঋণ ফেরত আসা শুরু করলেই সূচকের উন্নতি ঘটবে।
এদিকে ব্যাংকে পরিচালক ও শেয়ারহোল্ডারদের যে মূলধন রয়েছে, ২০১৪ সাল শেষে তার প্রায় ৬৮ শতাংশই খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। যদিও ২০১৩ সাল শেষে মূলধনের প্রায় ৬০ শতাংশ ছিল খেলাপি। যদিও ২০১২ সালে তা ছিল ৭৪ শতাংশ ছাড়িয়ে গিয়েছিল। ব্যাংকিং খাতে ২০১০ সালে মূলধনের ৫৪ দশমিক ৮ শতাংশ ছিল খেলাপি। ২০১০ সালে এ হার ছিল ৪৩ দশমিক ৬, ২০১২ সালে ৭৪ দশমিক ২, ২০১৩ সালে ৫৯ দশমিক ৮ ও ২০১৪ সালে ৬৭ দশমিক ৭ শতাংশ।
তথ্যমতে, ২০১৪ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকগুলোর মূলধন সংরক্ষণের প্রয়োজন ছিল ৬৭ হাজার ৬৮৫ কোটি টাকা। যদিও ব্যাংকগুলো সংরক্ষণ করে ৭১ হাজার ৭৫৪ কোটি টাকা। তবে এ সময়েই ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ দাঁড়ায় ৫০ হাজার ১৫৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ মূলধনের ৬৭ দশমিক ৭ শতাংশ খেলাপি হয়ে গেছে।
ব্যাংকভিত্তিক হিসাবে, ২০১৪ সালে অগ্রণী ব্যাংকের মূলধন ছিল ২ হাজার ৬৯০ কোটি টাকা। এ সময়ে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৩ হাজার ৭০৬ কোটি টাকা। একই সময়ে বেসিক ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি ছিল ১ হাজার ২৯০ কোটি ও খেলাপি ছিল ৬ হাজার ৩০৯ কোটি টাকা। জনতা ব্যাংকের ৩ হাজার ৬৯৫ কোটি টাকা মূলধনের বিপরীতে খেলাপির পরিমাণ ৩ হাজার ২৮৬ কোটি টাকা। এছাড়া রূপালী ব্যাংকের ১ হাজার ৬২৭ কোটি টাকা মূলধনের বিপরীতে খেলাপি ১ হাজার ২৩৬ কোটি ও সোনালীর ৩ হাজার ৫৫১ কোটি টাকার বিপরীতে ৮ হাজার ২২৪ কোটি টাকা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য পর্যালোচনায় এমন চিত্র পাওয়া গেছে।
একই সঙ্গে ২০১৪ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকিং খাতে মূলধন পর্যাপ্ততার হার দাঁড়িয়েছে ১১ দশমিক ৩৫; গত বছরের ডিসেম্বর শেষে যা ছিল ১১ দশমিক ৫২ শতাংশ।
জানতে চাইলে বিআইবিএমের সুপারনিউমারি অধ্যাপক ও পূবালী ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক হেলাল আহমেদ চৌধুরী বলেন, খেলাপি যা বলা হচ্ছে, তার বিপরীতে সঞ্চিতি সংরক্ষণ করা হয়েছে। ফলে এসব খেলাপি আদায় না হলেও মূলধনের ওপর কোনো আঘাত আসবে না। এছাড়া ব্যাংকগুলো প্রয়োজনের তুলনায় বেশি মূলধন সংরক্ষণ করছে, যা ইতিবাচক। খেলাপি আরো কমিয়ে আনতে পারলে ব্যাংকগুলোর স্বাস্থ্যও ভালো হবে।
এরই মধ্যেও সূচকে কিছুটা উন্নতি করেছে বেসরকারি খাতের কয়েকটি ব্যাংক। ইউসিবিএলের সম্পদ ও বিনিয়োগ থেকে আয় দশমিক ৬৩ ও ৫ দশমিক ৪৮ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে যথাক্রমে ১ দশমিক ৪ ও ১৪ দশমিক ৪৬ শতাংশ।
জানতে চাইলে ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এমডি মোহাম্মদ আলী বলেন, এসএমই ও রফতানিতে গুরুত্ব দেয়ায় ব্যাংকটির আয় বেড়েছে। রফতানিতে ৫৮ শতাংশ, এসএমইতে ৪২ ও অফশোর ব্যাংকিং ইউনিটে ২৫৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে ব্যাংকটির সার্বিক মুনাফায়।
রিটার্ন অন অ্যাসেট ও রিটার্ন অন ইকুইটি সূচকে উন্নতি করেছে বেসরকারি খাতেরই আরেক ব্যাংক ন্যাশনাল ব্যাংক। ২০১৪ সালে ব্যাংকটির সম্পদ ও বিনিয়োগ থেকে আয় দশমিক ৮৮ ও ৭ দশমিক ৪৪ থেকে বেড়ে হয়েছে যথাক্রমে ১ দশমিক শূন্য ৬ ও ৯ দশমিক ৩৪ শতাংশ।
সম্পদ ও বিনিয়োগ থেকে আয়ের সূচকে উন্নতি হয়েছে সাউথইস্ট ব্যাংকেরও। ২০১৩ সালে ব্যাংকটির রিটার্ন অন অ্যাসেট ও রিটার্ন অন ইকুইটি ছিল যথাক্রমে দশমিক ৯৮ ও ১০ দশমিক ৬৭ শতাংশ। ২০১৪ সালে তা বেড়ে হয়েছে ১ দশমিক ৫৮ ও ১৩ দশমিক ৮৮ শতাংশ।
ব্যাংকটির এমডি সহিদ হোসেন এ প্রসঙ্গে বলেন, ২০১৩-এর তুলনায় ২০১৪ সালে ব্যবসা কিছুটা ভালো হয়েছে। ফলে সূচকের উন্নতি ঘটেছে।
একইভাবে সম্পদ ও বিনিয়োগ থেকে আয়ের সূচকে উন্নতি হয়েছে এক্সিম, পূবালী ও সোনালী ব্যাংকের।
Discussion about this post