উৎপাদন কার্যক্রমে নেই একসময়ের বড় শিল্প গ্রুপ আল-আমিন। ২০১০ সাল থেকে গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন একে একে বন্ধ হতে থাকে। ২০১৩ সালে এসে তাদের সব প্রতিষ্ঠানই বন্ধ হয়ে যায়। ফলে আটকে গেছে সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড (এসআইবিএল), ইসলামী ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড, স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া, ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান, ইউসিবিএল, সাউথইস্ট, প্রাইম, ব্র্যাকসহ ডজনখানেক ব্যাংকের ৫০০ কোটি টাকার বেশি ঋণ। এ পাওনা আদায় নিয়ে উৎকণ্ঠায় রয়েছে ব্যাংকগুলো। আল-আমিন গ্রুপের সঙ্গে ব্যাংকগুলোর পাল্টাপাল্টি মামলাও চলছে। সর্বশেষ ১৯৭ কোটি টাকা আদায়ে গ্রুপটির আট একর জমি নিলামে তুলেছে এসআইবিএল।
জানা যায়, ১৯৬৮ সালে নোয়াখালীর চৌমুহনীতে মোস্তফা বেকারি দিয়ে ব্যবসায়িক কার্যক্রম শুরু করে আল-আমিন গ্রুপ। ১৯৭৩ সালের দিকে নোয়াখালী সরকারি কলেজ সড়কে গড়ে ওঠে আল-আমিন ব্রেড অ্যান্ড বিস্কুট ফ্যাক্টরি। আল-আমিন সুপার বিস্কুট, রেইচি, কসমস, টুনি, পাইনাপেল, গ্লুকোজসহ ২১-২২ ধরনের বিস্কুট উৎপাদন হতে থাকে এখানে। পরে ভোজ্যতেল, বেভারেজ, ফার্মাসিউটিক্যাল খাতে ব্যবসা সম্প্রসারণ করে আল-আমিন গ্রুপ। প্রতিষ্ঠানটির এ উন্নতির সময় ব্যাংকগুলোও উদার হস্তে অর্থায়ন করে।
সূত্রমতে, ২০০৪ সালে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের ব্যবস্থাপনায় সাতটি ব্যাংক ৩১ কোটি টাকা সিন্ডিকেট অর্থায়ন করে আল-আমিন ব্রেড অ্যান্ড বিস্কুট লিমিটেডে। অর্থায়নকারী অন্য ব্যাংকগুলো হলো— স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া, ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান, ইউসিবিএল, সাউথইস্ট, প্রাইম ও ব্র্যাক ব্যাংক। পরে ঋণখেলাপি হয়ে গেলে দুই দফা পুনঃতফসিল করা হয়। এর পরও ঋণ শোধ করতে পারেনি গ্রুপটি। সর্বশেষ পাওনা আদায়ে অর্থঋণ আদালতে মামলা করে ব্যাংকগুলো।
বিষয়টি নিশ্চিত করে ইউসিবিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আলী বলেন, অর্থ আদায়ে আইনি লড়াই চলছে। স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ঋণটির লিড অ্যারেঞ্জার হওয়ায় তারাই আইনি বিষয় নিয়ে কাজ করছে। একই কথা জানান ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমানও। তিনি বলেন, ‘আমরা স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের নেতৃত্বে সিন্ডিকেট ঋণে অংশ নিয়েছিলাম। সেটা খেলাপি হয়ে গেছে। অর্থ আদায়ে এখন আইনি চেষ্টা চলছে।’
এদিকে খেলাপি হওয়া সত্ত্বেও ২০০৮ সালে এসআইবিএলের বাবুবাজার শাখা গ্রুপটিকে ১৬০ কোটি টাকা অর্থায়ন করে। ব্যাংকটির ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বিশেষ আগ্রহে এ অর্থায়ন করা হয়। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০০৬-১০ সালে সোস্যাল ইসলামী ব্যাংকের বাবুবাজার শাখার ব্যবস্থাপক ছিলেন তারিক মোরশেদ। এ সময় গ্রুপটি ঋণখেলাপি থাকলেও ২০০৮ সালেই শাখা থেকে ঋণ প্রস্তাব পর্ষদে পাঠানো হয়। পর্ষদও ঋণটি অনুমোদন করে। তবে ২০১০-১২ সালে শাখার দায়িত্বে থাকা ব্যবস্থাপক এমএ জলিলের সময়ে ঋণটি অনিয়মিত হয়ে পড়ে। এ সময় তাকেসহ শাখার কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করে ব্যাংকটি। তবে তারিক মোরশেদ এখনো কর্মরত ব্যাংকটিতে। আর সর্বশেষ হিসাবে, গ্রুপটির মেসার্স আল-আমিন সুইটস অ্যান্ড ক্র্যাকার্স ও মেসার্স আল-আমিন বেভারেজ ইন্ডাস্ট্রিজের কাছে এসআইবিএলের পাওনা দাঁড়িয়েছে ১৯৭ কোটি টাকা। এজন্য নোয়াখালীতে গ্রুপটির আট একর জমি নিলামে তুলেছে ব্যাংকটি। একই প্রতিষ্ঠানের কাছে ইসলামী ব্যাংক চৌমুহনী শাখার পাওনা দাঁড়িয়েছে ১৮২ কোটি টাকা। এজন্য গ্রুপটির সঙ্গে মামলা চলছে ব্যাংকটির।
ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আবদুল মান্নান এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘আমরা যখন এ গ্রুপে বিনিয়োগ করি, তখন তাদের ভালো ব্যবসা ছিল। ঋণ পরিশোধও ছিল নিয়মিত। এখন প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিনিয়োগ আটকে গেছে। আমরাও অর্থ আদায়ে আইনি চেষ্টা অব্যাহত রেখেছি।’
জানা যায়, আল-আমিন ব্রেড অ্যান্ড বিস্কুট দিয়ে শুরু হলেও পরে বিভিন্ন শাখায় ব্যবসা সম্প্রসারণ করে প্রতিষ্ঠানটি। হাবিব ভেজিটেবল অয়েল মিল, আল-আমিন বেভারেজ লিমিটেড, সিলভা ফার্মাসিটিউক্যালস লিমিটেড, আল-আমিন সুইটস অ্যান্ড ক্র্যাকার্স, আল-আমিন কনজিউমারস, আল-আমিন এগ্রো ফিশারিজ, আল-আমিন পলিথিন মিলস লিমিটেড, আল-আমিন প্যাকেজিং লিমিটেড, আল-আমিন লজিস্টিক লিমিটেড, আল-আমিন গেস্ট হাউসসহ আরো কয়েকটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে আল-আমিন গ্রুপ। শিল্প গ্রুপটির উৎপাদিত মিনার মার্কা সয়াবিন তেল, কোমল পানীয় ডাবল কোলা, ডিউ মিনারেল ওয়াটার, চিপস, রিও মোটর-বাদাম, চানাচুর, এগ নুডল্স, লাচ্ছা সেমাই ও বিভিন্ন ধরনের ওষুধ দেশের বিভিন্ন বাজারে বেশ সুনামও অর্জন করে। তবে মূল ব্যবসা থেকে সরে গিয়ে জমি কেনা ও অন্য ব্যবসায় মনোযোগী হয়ে পড়লে ২০১০ সাল থেকে বন্ধ থাকে প্রতিষ্ঠানগুলো। এর ধারাবাহিকতায় গত বছর গ্রুপের সবগুলো প্রতিষ্ঠানই বন্ধ হয়ে যায়।
এ ব্যাপারে কথা বলতে আল-আমিন গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনোয়ার মির্জা ও পরিচালক (মানবসম্পদ) হাসান মির্জার (রিজভী) সঙ্গে কয়েকবার টেলিফোনে যোগাযোগ করা হলেও মন্তব্য করতে রাজি হননি তারা। গ্রুপটির হিসাব বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক মো. ইকবালের কাছে জানতে চাইলে বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘আমাদের হিসাবে ব্যাংক কোনো অর্থ পাবে না। যা তারা দাবি করছে, তা সুদ ও ক্ষতিপূরণের অর্থ। এজন্য ব্যাংকগুলো আমাদের বিরুদ্ধে মামলার পাশাপাশি জমিও নিলামে তুলছে। আমরাও সুরাহা পেতে আদালতের দ্বারস্থ হচ্ছি। শিগগিরই আমরা বিস্কুট কারখানা চালু করব।’
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মাইজদী বাজার পুরাতন নোয়াখালী সরকারি কলেজ সড়কের পাশে প্রায় ২০ একর জায়গার ওপর গড়ে উঠেছে আল-আমিন বিস্কুট ও সুইটস অ্যান্ড ক্র্যাকার্স কারখানা। দত্তেরহাটের বিনোদপুর এলাকায় প্রায় ৩৩ একর জায়গাজুড়ে রয়েছে গ্রুপের বেভারেজ কারখানা। হরিনারায়ণপুর স্কুলের সামনে জেলা শহরের প্রধান সড়কের পশ্চিম পাশে প্রায় দেড় একর জায়গার ওপর সিলভা ফার্মা এবং সুবর্ণচর উপজেলার চর মজিদ ও দক্ষিণ চর মজিদে প্রায় ১৫০ একর একর জায়গায় আল-আমিন এগ্রো ফিশারিজ গড়ে তোলা হয়েছে। এছাড়া নোয়াখালী, ঢাকা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে গেস্ট হাউস, আবাসন ব্যবসার পাশাপাশি নিজস্ব সম্পত্তি রয়েছে গ্রুপটির। আল-আমিন লজিস্টিকের আওতায় রয়েছে লরি, জিপ, মাইক্রোবাস, খোলা ট্রাক, মোটরসাইকেলসহ ২০ ধরনের প্রায় এক হাজার যানবাহন।
গতকাল আল-আমিন বিস্কুট ফ্যাক্টরির সামনে অপেক্ষা করতে দেখা যায় কারখানার বেশ কয়েকজন শ্রমিককে। তাদেরই একজন সত্তরোর্ধ্ব আবুল কাশেম। তিনি বলেন, ‘প্রায় সাত মাস হলো বেতন-ভাতা পাই না। তার পরও এসে বসে থাকি। যদি ফ্যাক্টরি চালু হয়, সে আশায়।’
Discussion about this post