কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়নে দেশের ৮৫ শতাংশ ব্যাংকের প্রশিক্ষণ নীতিমালা থাকলেও ৭৫ শতাংশের রয়েছে বছরজুড়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণ ক্যালেন্ডার। তবে প্রতিষ্ঠানগুলোর ৫২ শতাংশই প্রশিক্ষণ-পরবর্তী কোনো মূল্যায়ন করে না। ৫০ শতাংশ ব্যাংকই কর্মীদের মূল্যায়নে প্রশিক্ষণের মূল্যায়ন প্রতিবেদনকে বিবেচনায় নেয় না। ফলে প্রচলিত বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই ব্যাংক কর্মীদের মূল্যায়ন করা হচ্ছে। সম্প্রতি বিআইবিএমের বার্ষিক ব্যাংকিং সম্মেলনে সংস্থাটির মহাপরিচালক তৌফিক আহমদ চৌধূরী এমন মতামত তুলে ধরেন।
কর্মী মূল্যায়নের ক্ষেত্রে পারফরম্যান্স ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (পিএমএস) চালু এবং ব্যাংকের ব্যবসা ও পরিবেশ পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মূল্যায়নের পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আনার বিষয়টি উঠে এসেছে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট রিভিউ-২০১৪ প্রতিবেদনে।
আইএফআইসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহ আলম সারওয়ার এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, পদোন্নতি ও পুরস্কার— দুই-ই আসে কাজের মূল্যায়ন থেকে। প্রশিক্ষণের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। প্রশিক্ষণ নিলেই কাউকে পদোন্নতি দিতে হবে, এ ধারণা সঠিক না। ব্যাংকগুলোয় নতুন নতুন সেবা-প্রযুক্তি আসছে। কিন্তু এজন্য কর্মী ছাঁটাই করা হচ্ছে না। উপরন্তু তাদের পদোন্নতি দিয়ে ব্যাংকে রাখা হচ্ছে।
এ বিষয়ে বিআইবিএমের পরিচালক (প্রশিক্ষণ) অধ্যাপক ড. শাহ মো. আহসান হাবীব বলেন, আমরা ব্যাংকগুলো থেকে তথ্য নিয়েই প্রতিবেদন করে থাকি। তবে দেখা যাচ্ছে, ব্যাংকগুলো কর্মীদের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে নানা উদ্যোগ নিচ্ছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, ব্যাংক চায় প্রশিক্ষিত কর্মীরা দীর্ঘসময় ব্যাংকে সেবা প্রদান করুক। আর কর্মীরা একটু সুবিধা পেলেই অন্যত্র চলে যাচ্ছে। আবার দেখা যাচ্ছে, এক ব্যাংক থেকে অন্য ব্যাংকে গেলে বেশি সুবিধা বা উঁচু পদ পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া ব্যাংকগুলোও কর্মী ধরে রাখতে একাধিক নতুন পদ তৈরি করছে। এজন্য বেসরকারি ব্যাংকগুলো কর্মীদের মান উন্নয়ন, পদোন্নতি এসব পর্যালোচনায় সমন্বিত উদ্যোগ নিতে পারে।
বিআইবিএমের বার্ষিক ব্যাংকিং সম্মেলনে ‘ইফেক্ট অব এইচআর প্র্যাকটিসেস অন এমপ্লয়িজ পারফরম্যান্স ইন ব্যাংকিং ইন্ডাস্ট্রিজ’ শীষর্ক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই সহযোগী অধ্যাপক আব্দুস সালাম সরকার ও মুন্সী মুহাম্মদ আব্দুল কাদের জিলানী। এতে বলা হয়, ব্যাংকিং খাতের কর্মীদের সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রেই বিধি মোতাবেক আচরণ করা হয় না। এটা বিকেন্দ্রীকরণ ও আলোচনার ভিত্তিতে হওয়া দরকার। সে সঙ্গে কর্মী সহায়ক মানবসম্পদ পরিবেশ তৈরির পাশাপাশি সঠিকভাবে দায়িত্ব পালনে কর্মীদের ঊর্ধ্বতন স্তর থেকে পরামর্শ নেয়ার সুযোগ দেয়া উচিত। এতে বলা হয়, সরকারি ব্যাংকগুলোর মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় প্রধান ভূমিকা পালন করে অর্থ। এজন্য এসব ব্যাংকের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। ব্যাংকের নিট আয়ের ওপরও এর প্রভাব রয়েছে।
জানা গেছে, ২০১৩ সালে সরকারি ব্যাংকগুলোর নিট আয় ছিল ২ হাজার ২৫৮ কোটি টাকা। সে সময় এ খাতে কর্মী ছিল ৫৮ হাজার ৪৯ জন। তবে ২০১৪ সালে এ আয় কমে ১ হাজার ২২৭ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। এ সময়ে ব্যাংকগুলোয় কর্মীর সংখ্যাও কমে দাঁড়ায় ৫৬ হাজার ১৮৭ জনে।
বেসরকারি ব্যাংকগুলোয় ২০১৩ সালে নিট আয় হয় ৪ হাজার ৬৪৪ কোটি টাকা। এ সময়ে কর্মীর সংখ্যা ছিল ৮৫ হাজার ৮৮৮ জন। তবে ২০১৪ সালে নিট আয় বেড়ে দাঁড়ায় ৫ হাজার ৫০৮ কোটি টাকা। এ সময় কর্মীর সংখ্যাও বেড়ে হয় ৯৩ হাজার ৬২৪ জন।
বিদেশী ব্যাংকগুলোর ২০১৩ সালে নিট আয় হয় ১ হাজার ৪৬৪ কোটি টাকা। এ সময়ে ব্যাংকের কর্মী ছিল ৩ হাজার ৩৩০ জন। ২০১৪ সালে নিট আয় বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৭৯৮ কোটি টাকা। এ সময়ে ব্যাংকের কর্মীর সংখ্যাও বেড়ে ৩ হাজার ৮৮০ জনে দাঁড়ায়। আর বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর ২০১৩ সালের নিট মুনাফা হয় ৪৯ কোটি টাকা। এ সময়ে এ খাতে ২ হাজার ৯৭১ জন কর্মরত ছিলেন। ২০১৪ সালে আয় কমে ৩ কোটি টাকায় এলেও কর্মী বেড়ে দাঁড়ায় ৩ হাজার ১১৫ জন।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, ব্যাংকগুলোর সম্পদ থেকে প্রাপ্ত মুনাফার পরিমাণের ধারণা পাওয়া যায় রিটার্ন অন অ্যাসেট থেকে। ২০১০ সালে ব্যাংকগুলোর সম্পদ থেকে আয় ছিল ১ দশমিক ৭ শতাংশ। তবে ২০১৪ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে দশমিক ৭ শতাংশ। ২০১৩ সালে এ আয় ছিল দশমিক ৯ শতাংশ।
ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডারদের পাওয়া মুনাফার ধারণা পাওয়া যায় রিটার্ন অন ইকুইটি থেকে। এ হিসেবে ২০১০ সালে শেয়ারহোল্ডাররা মুনাফা পেয়েছেন ১৯ দশমিক ৯ শতাংশ। ২০১৪ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ১ শতাংশ। ২০১৩ সালে এটি ছিল ১০ দশমিক ৭ শতাংশ। তবে ব্যাংকগুলো এখন আগের থেকে বেশি হারে মূলধন সংরক্ষণ করছে।
Discussion about this post