বিদেশী ঋণ অপব্যবহারে জড়িয়ে পড়ছে ব্যাংক ও করপোরেটরা। ব্যাংকিং খাতে স্থানীয় প্রতিষ্ঠান যেমন রয়েছে, একই সঙ্গে আছে বিদেশী ব্যাংকও। স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড, ইস্টার্ন ও ব্র্যাক ব্যাংকের নাম এরই মধ্যে উঠে এসেছে। করপোরেট খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে এপেক্স, প্রাণ-আরএফএল, অনন্ত, নাজ বাংলাদেশ লিমিটেড ও ইপিলিয়ান লিমিটেডসহ আরো কিছু প্রতিষ্ঠান।
নাজ বাংলাদেশ ও ইপিলিয়ান লিমিটেডের বিদেশী ঋণ অপব্যবহারের ঘটনায় ইস্টার্ন ব্যাংককে জরিমানা করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। যদিও তা কার্যকর হয়নি। আর অনন্ত অ্যাপারেলসের ঋণ অপব্যবহারের ঘটনায় বিদেশী ঋণ গ্রহণের মাধ্যম হিসেবে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংককে মনোনয়নে নিরুত্সাহিত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই ঘটনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়েছে প্রাণ।
বিদেশী ঋণের অনুমোদন দেয়া হয় বিনিয়োগের শর্তে। কিন্তু অনেক প্রতিষ্ঠানই এ শর্ত ভঙ্গ করেছে। বিদেশী ঋণ এনে স্থানীয় ব্যাংকের দায় পরিশোধ করা হয়েছে। কেউ কেউ আবার বিনিয়োগ না করে স্থায়ী আমানত হিসেবে জমা রাখছে।
http://www.bonikbarta.com/2015-02-16/news/details/28736.html
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, বিদেশী ঋণ নিয়ে কোনো ধরনের অনিয়ম সহ্য করা হবে না। যত বড় প্রতিষ্ঠান বা ব্যাংক হোক না কেন, কেউ ছাড় পাবে না। সব বিদেশী ঋণ পরিদর্শন করা হচ্ছে। কেউ অনিয়ম করে থাকলে ক্রমান্বয়ে তা বের হয়ে আসবে। ঋণ অনুমোদনেও কঠোরতা অবলম্বন করা হচ্ছে।
জানা গেছে, ২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বেসরকারি খাতে ৬১৬ কোটি ৪৩ লাখ ডলার ঋণ অনুমোদন করে বৈদেশিক ঋণ অনুমোদন-সংক্রান্ত বাছাই কমিটি। এ সময় দেশের ব্যাংকগুলোর ঋণ প্রবৃদ্ধি কমলেও বাড়তে থাকে বৈদেশিক ঋণ। অবশেষে গত বছর বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতের ঋণ লক্ষ্যমাত্রায় বিদেশী ঋণকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। বিভিন্ন ব্যাংক কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িতরাও বিদেশী ঋণ অনুমোদন পাওয়ায় এর ব্যবহার খতিয়ে দেখার উদ্যোগ নেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এতেই বেরিয়ে আসে বিদেশী ঋণ অপব্যবহারের বিষয়টি।
এ বিষয়ে বিনিয়োগ বোর্ডের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, শর্ত ভাঙলে পরবর্তীতে ওই প্রতিষ্ঠান আর ঋণ পাবে না। ব্যাংকেরও এক্ষেত্রে দায়িত্ব আছে। দায়িত্ব পালনে যারা ব্যর্থ হয়েছে, তাদের মাধ্যমে ঋণ প্রস্তাব গ্রহণ না করার বিষয়েও ভাবা হচ্ছে। পরবর্তী সভায়ই বিষয়টি চূড়ান্ত হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিনিয়োগ বোর্ড সূত্রে জানা যায়, প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান মেসার্স সিলভান এগ্রিকালচার লিমিটেড ব্র্যাক ব্যাংকের মাধ্যমে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) থেকে ঋণ নেয়। কিন্তু বিনিয়োগের পরিবর্তে তা দিয়ে সহযোগী প্রতিষ্ঠানের দায় পরিশোধ করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক এ নিয়ে প্রশ্ন তুললে নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করে গ্রুপটি।
জানতে চাইলে প্রাণের পরিচালক ইলিয়াস মৃধা বলেন, ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঋণ ব্যবহারের বিষয়ে আপত্তি তোলায় আমরা ব্র্যাকের পুরো অর্থ শোধ করে দিয়েছি। ভবিষ্যতে এমন হবে না বলে আমরা ক্ষমাও চেয়েছি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে।’
ইন্টারন্যাশনাল ফিন্যান্স করপোরেশন (আইএফসি) ও নেদারল্যান্ডসের এফএমও থেকে ঋণ এনে দেশীয় ঋণ পরিশোধ করার প্রমাণ মিলেছে অনন্ত অ্যাপারেলসের বিরুদ্ধে। স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের মাধ্যমে নেয়া বিদেশী ঋণ বিনিয়োগ না করে স্থানীয় ব্যাংকের দায় পরিশোধে ব্যবহার করেছে তারা। এ ঋণের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে না পারায় বিদেশী ঋণ গ্রহণের মাধ্যম হিসেবে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডকে মনোনয়নে নিরুত্সাহিত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বিষয়টি জানিয়ে সম্প্রতি বিনিয়োগ বোর্ডে চিঠিও দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিনিয়োগ বোর্ডও বিদেশী ঋণ গ্রহণে আগ্রহীদের স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংককে মনোনীত না করার পরামর্শ দিচ্ছে। বোর্ডের পরবর্তী বাছাই কমিটির সভায় বিষয়টি উপস্থাপন করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হবে বলে জানা গেছে।
বিনিয়োগ বোর্ডের নির্বাহী চেয়ারম্যানের কাছে পাঠানো ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, বিনিয়োগ বোর্ডের অনুমোদনের পরিপ্রেক্ষিতে আইএফসি ও নেদারল্যান্ডসের এফএমও কর্তৃক মঞ্জুরিকৃত ঋণের আংশিক স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের মাধ্যমে অনন্ত অ্যাপারেলসের অনুকূলে পাঠানো হয়। কিন্তু স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বিষয়টি যথাযথভাবে পর্যবেক্ষণ না করায় ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগ বোর্ডের নির্দেশনা লঙ্ঘন করে। তারা ঋণের এ অর্থ বিনিয়োগ বোর্ড অনুমোদিত কাজে ব্যবহার না করে তা দিয়ে প্রাইম, ইস্টার্ন ও স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের উচ্চ সুদহারের ঋণ সমন্বয় করেছে। ফলে বিনিয়োগ বোর্ড যে উদ্দেশ্যে আলোচ্য বৈদেশিক ঋণের অনুমতি দিয়েছিল, তা সম্পূর্ণ ব্যাহত হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের বাংলাদেশ শাখার হেড অব করপোরেট অ্যাফেয়ার্স বিটপি দাস চৌধুরীর সঙ্গে ই-মেইল ও সেলফোনে যোগাযোগ করা হলেও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
এছাড়া এপেক্স গ্রুপের বিরুদ্ধে বিদেশী ঋণ এনে বিনিয়োগ না করে স্থায়ী আমানত (এফডিআর) রাখার প্রমাণ পাওয়া গেছে। এসব ঘটনায় ও ঋণ প্রস্তাব পূর্ণাঙ্গ না হওয়ায় প্রাণ-আরএফএল, বিল্ড ট্রেড, নভোএয়ার, বাংলা ট্র্যাক, সাউথইস্ট গার্মেন্টস, প্রিসিজন এনার্জি, জেএম ফ্যাব্রিকস, আর ইন্টারন্যাশনাল ও ডেনিটেক্সের ঋণ অনুমোদন আটকে দিয়েছে এ-সংক্রান্ত কমিটি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর এসকে সুর চৌধুরী বলেন, ‘বিদেশী ঋণের অনুমোদন বিনিয়োগ বোর্ড দিয়ে থাকে। তবে অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে আমরা বিশেষ উদ্যোগে বিদেশী ঋণ ব্যবহার নিয়ে তদন্ত শুরু করেছি। এতে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিদেশী ঋণ অপব্যবহারের বিষয়টি ধরা পড়েছে। ব্যাংকের অবহেলা প্রমাণ হলে ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। বিদেশী ঋণ হলেও ছাড় দেয়ার কোনো সুযোগ নেই।’
Discussion about this post