বেনামি ঋণের দিকে ঝুঁকে পড়ছেন ব্যাংক পরিচালকরা। সম্প্রতি পরিচালকদের ১ হাজার কোটি টাকার বেশি বেনামি ঋণের খোঁজ পেয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ ঘটনায় ন্যাশনাল ও মার্কেন্টাইল ব্যাংকে পর্যবেক্ষকও নিয়োগ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে এখন পর্যন্ত কোনো পরিচালককে শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়নি।
তদন্তে হাজার কোটি টাকার বেশি বেনামি ঋণের খোঁজ মিললেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অফসাইট সুপারভিশন, ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি, ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটি অ্যান্ড কাস্টমার সার্ভিসেস ও ব্যাংক পরিদর্শন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, পরিচালকদের বেনামি ঋণের পরিমাণ আড়াই হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, সাম্প্রতিক সময়ে পরিদর্শনে পাঁচটি ব্যাংকে পরিচালকদের ১ হাজার কোটি টাকার বেশি বেনামি ঋণের সন্ধান মিলেছে। এর মধ্যে ন্যাশনাল ব্যাংকে ১৩২ কোটি, মার্কেন্টাইল ব্যাংকে ২৫০ কোটি, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকে ২৩৫ কোটি, শাহজালাল ব্যাংকে ৩১৫ কোটি ও এবি ব্যাংকে ৮৮ কোটি টাকা।http://www.bonikbarta.com/news/details/22562.html
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মাহফুজুর রহমান বলেন, ব্যাংক পরিচালকদের ঋণ পৃথকভাবে তদারক করা হয়। বেনামি ঋণ নিয়ে ধরা পড়লে তারও ব্যবস্থা নেয়া হয়। এজন্য সম্প্রতি দুটি ব্যাংকে পর্যবেক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তে ন্যাশনাল ব্যাংক থেকে পরিচালকদের বেনামি ঋণ গ্রহণের প্রমাণ মিলেছে। ব্যাংকটির সীমান্ত স্কয়ার শাখা থেকে রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট স্টক কোম্পানিজ অ্যান্ড ফার্মাসে নিবন্ধিত হওয়ার এক বছর সাতদিন আগে ক্যামব্রিজ ইন্টারন্যাশনালকে ১৩২ কোটি টাকার ঋণ দেয়া হয়েছে, যার সুবিধাভোগী ব্যাংকটির পরিচালকরাই।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়, ক্যামব্রিজ ইন্টারন্যাশনালের ঋণের নামে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান, পরিচালক, তার স্ত্রী ও মেয়ে পরস্পর জোগসাজশে ১৩২ কোটি টাকা নিয়ে লাভবান হয়েছেন। এছাড়া ন্যাশনাল ব্যাংক থেকে রায়েরবাজার এলাকায় জমি কেনার নামে আরো ঋণ নেয়া হয়েছে। এর মধ্যে নূর হোসেন ট্রেডার্সের ঋণ রয়েছে, যেগুলোকে পরিচালকদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ঋণ হিসেবে শনাক্ত করা হয়। এসব ঘটনায় ব্যাংকটিতে পর্যবেক্ষক নিয়োগ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের ফরেক্স রিজার্ভ অ্যান্ড ট্রেজারি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের মহাব্যবস্থাপক কাজী ছাইদুর রহমানকে পর্যবেক্ষক নিয়োগ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে অবৈধ সুবিধাভোগী দুজন ব্যাংক পরিচালক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ব্যবসায় প্রতিনিয়ত ঋণের প্রয়োজন পড়ে। আমাদের ঋণের সীমাও বেঁধে দেয়া আছে। পদে পদে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন প্রয়োজন হয়। তাই বেনামি ঋণ গ্রহণ করতে হয়। এ সম্পর্কে পুরো পষর্দই অবগত থাকে। বেনামি হওয়ায় এ ঋণ শোধের চাপ থাকে না। ফলে পরিচালক পদেও বহাল তবিয়তে থাকা যায়। কিন্তু খেলাপি হলে তো পরিচালক হিসেবে থাকা যায় না। পাশাপাশি অন্য ব্যাংকের পরিচালককে আমাদের ব্যাংকের সুবিধা দিয়েও অনেক সময় সে ব্যাংক থেকে সুবিধা গ্রহণ করা হয়।’
তবে এ বিষয়ে ব্যাংক উদ্যোক্তাদের সংগঠন ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (বিএবি) চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক পরিচালকদের দায়দায়িত্ব নির্ধারণ করে দিয়েছে। তাই পরিচালকদের প্রভাব খাটিয়ে বেনামি ঋণ নেয়ার সুযোগ নেই। ব্যাংকের ঋণ কে নিল, তা দেখার দায়িত্ব ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি)। যদি কোনো পরিচালক বেনামেও ঋণ নিয়ে থাকেন, এজন্য এমডিই দায়ী। কোনো পরিচালকের বেনামে ঋণের চাপের বিষয়টি এমডি সময়মতো কেন্দ্রীয় ব্যাংককে জানালেই তো সমাধা হয়ে যায়। তবে এমডিরা অসৎ হয়ে গেলে তো কিছু করার নেই।
এদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদন্তে মার্কেন্টাইল ব্যাংকের পরিচালক মো. আবদুল হান্নান ঋণখেলাপি থাকা অবস্থায় বেনামি প্রতিষ্ঠানের প্রায় ২৫০ কোটি টাকা ঋণ নেয়ার তথ্য বেরিয়ে আসে। পরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ ঋণ ওই পরিচালকের হিসাবে দেখানোর নির্দেশ দেয়। আর্থিক অবস্থার অবনতিতে মার্কেন্টাইল ব্যাংকে পর্যবেক্ষক নিয়োগ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। সংশোধিত ব্যাংক কোম্পানি আইনের ৪৯ ধারা অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রানীতি বিভাগের মহাব্যবস্থাপক মো. মাসুদ বিশ্বাসকে পর্যবেক্ষক নিয়োগ করা হয়।
এছাড়া এবি ব্যাংকের এলিফ্যান্ট রোড শাখা থেকে ব্যাংকিং বিধিবিধান লঙ্ঘন করে উত্তরা ট্রেডার্সকে ৮০ কোটি টাকা ঋণ প্রদান করা হয়, যার পুরোটার সুবিধাভোগী সালমান এফ রহমানের মালিকানাধীন বেক্সিমকো গ্রুপের প্রতিষ্ঠান ঢাকা ইন্ডাস্ট্রিজ।
ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক থেকে পারটেক্স গ্রুপের ২৩৫ কোটি টাকা ঋণের সন্ধান পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকেও পরিচালকদের ৩১৫ কোটি টাকা বেনামি ঋণের তথ্য পাওয়া গেছে। এর বাইরেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদন্তে বিভিন্ন সময় ব্যাংকগুলোয় পরিচালকদের বেনামি ঋণের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে। এগুলোর দায় একপর্যায়ে পরিচালকদের ওপর চাপানো হচ্ছে। এখন পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিভিন্ন সময়ের তদন্তে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি), সিটি, উত্তরা, পূবালী, ন্যাশনাল, আইএফআইসি, ফার্স্ট সিকিউরিটি, শাহজালাল, প্রিমিয়ার, ওয়ান, মার্কেন্টাইল ও সাউথইস্ট ব্যাংকে বেনামি ঋণের সন্ধান পাওয়া গেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্র বলছে, এক্সিম ব্যাংকের গুলশান শাখায় ব্যাংকের পরিচালকের নামে বেনামি প্রায় ৩০০ কোটি টাকার ঋণ রয়েছে, যার তদন্ত করতে গিয়ে ফিরে আসতে হয় পরিদর্শক দলকে।
তবে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার এ বিষয়ে বলেন, ‘আমার ব্যাংকে বেনামি কোনো ঋণ নেই। ঋণের ৯০ শতাংশই নিরাপদ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকও পর্যবেক্ষণে দেখেছে, ঋণগ্রহীতা সবাই প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী।’
এসব বিষয়ে এবিবির সাবেক চেয়ারম্যান ও মেঘনা ব্যাংকের এমডি মোহাম্মদ নুরুল আমিন বলেন, পরিচালকদের নিজ নামে ঋণ নেয়ার সীমা নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে। এজন্য অনেকেই নাম গোপন করে ঋণ সুবিধা নিচ্ছেন। এছাড়া খেলাপি হয়ে গেলে পরিচালক পদ চলে যাবে। এ কারণেও অনেকেই নাম গোপন করছেন।
Discussion about this post