বেসিক ব্যাংকের খেলাপি ঋণ আসলে কত? ব্যাংকটির হিসাবে তাদের খেলাপি ঋণ ৬ হাজার কোটি টাকার কিছু বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে এর পরিমাণ প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা। আর বহিঃনিরীক্ষকের হিসাবে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ ৮ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। গভর্নরের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে বেসিক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক খোন্দকার মো. ইকবাল নিজেই খেলাপি ঋণের তিন ধরনের তথ্য তুলে ধরেছেন।
গত এপ্রিলে পাঠানো ওই চিঠিতে বেসিক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক উল্লেখ করেছেন, ‘২০১০-১৪ সালে ঋণ মঞ্জুর ও বিতরণে গুরুতর অনিয়ম হওয়ায় ওই সময় বিতরণকৃত অধিকাংশ ঋণই বর্তমানে শ্রেণীকৃত ঋণে পরিণত হয়েছে। ব্যাংকটির আর্থিক অবস্থার ওপর এর বিরূপ প্রভাব পড়েছে। ২০১৪ সালের বার্ষিক হিসাবে বাংলাদেশ ব্যাংক ও বহিঃনিরীক্ষক প্রতিষ্ঠান শ্রেণীকৃত ঋণ ও রক্ষিতব্য সঞ্চিতির পরিমাণ নির্ধারণ করেছে; যা ব্যাংক কর্তৃক নির্ণীত সঞ্চিতির চেয়ে বেশি।’
এমডির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর হিসাবে বেসিক ব্যাংক নিরূপিত খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬ হাজার ৩১০ কোটি টাকা বা বিতরণ করা মোট ঋণের ৫২ দশমিক ৮৫ শতাংশ। আর বাংলাদেশ ব্যাংকের নিরীক্ষা অনুযায়ী এর পরিমাণ ৬ হাজার ৯০৮ কোটি টাকা বা বিতরণ করা ঋণের ৫৭ দশমিক ৮৭ শতাংশ। অন্যদিকে বহিঃনিরীক্ষকের হিসাব অনুযায়ী বেসিক ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৮ হাজার ১০৯ কেটি টাকা; যা বিতরণ করা মোট ঋণের ৬৭ দশমিক ৯৩ শতাংশ।
ফারাক রয়েছে ব্যাংকটির মূলধন ঘাটতির তথ্যেও। বেসিক ব্যাংকের হিসাবে ব্যাংকটির মূলধন ঘাটতি ২ হাজার ২২৬ কোটি। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে এর পরিমাণ ২ হাজার ৪৭৮ কোটি ও বহিঃনিরীক্ষকের হিসাবে ৩ হাজার ৬৩৪ কোটি টাকা।
ঋণ অনিয়ম-পরবর্তী ব্যাংকটির সার্বিক অবস্থাও চিঠিতে তুলে ধরেছেন বেসিক ব্যাংক এমডি। চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেছেন, ২০১০-১৪ সালে অনিয়মিত ঋণ বিতরণের কারণে ব্যাংকের বিদ্যমান আর্থিক ব্যবস্থা বিবেচনায় দেশী-বিদেশী প্রায় সব ব্যাংক বেসিক ব্যাংকের সঙ্গে আর্থিক লেনদেন বন্ধ করে দেয়। বিশেষ করে বিদেশী ব্যাংকগুলো বেসিক ব্যাংকের এলসি গ্রহণ ও কনফারমেশন না করায় ব্যাংকটির বৈদেশিক বাণিজ্য প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ফলে ব্যাংকের অনেক ভালো গ্রাহক অন্য ব্যাংকের সঙ্গে ব্যবসা করছেন। নতুন পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রায় সব দেশীয় ও গুটিকয়েক বিদেশী ব্যাংক বর্তমানে বেসিক ব্যাংকের সঙ্গে বৈদেশিক বাণিজ্য সম্পন্ন করছে; আগামীতে যা আরো বাড়বে বলে আশা করা যায়।
২০১০-১৪ সালের জুলাই পর্যন্ত প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করেছে বেসিক ব্যাংক। এ ঋণ বিতরণে কোনো নীতিমালা অনুসরণ করা হয়নি বলে চিঠিতে উল্লেখ করেছেন ব্যাংকটির এমডি। চিঠির ভাষ্য অনুযায়ী, নিয়ম না মানায় বিতরণকৃত অধিকাংশ ঋণই বর্তমানে খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এর মধ্যে কিছু ঋণ রয়েছে, যা আদায়ের সম্ভাবনা একেবারেই ক্ষীণ।
আদায় অনিশ্চিত ঋণগুলোকে ব্লকড অ্যাসেট হিসেবে স্থানান্তরকরণ এবং শ্রেণীকৃত বাকি ঋণ ও অন্যান্য সম্পদের বিপরীতে রক্ষিতব্য সঞ্চিতি ১০ বছরে কর-পরবর্তী নিট মুনাফা থেকে সংরক্ষণের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে আবেদন করেন খোন্দকার মো. ইকবাল। এতে তিনি ২ হাজার ৯৯৯ কোটি টাকা শ্রেণীকৃত ঋণ প্রস্তাবিত ব্লকড অ্যাসেট হিসেবে স্থানান্তর ও অবশিষ্ট ৫ হাজার ১১০ কোটি টাকা শ্রেণীকৃত ঋণের বিপরীতে রক্ষিতব্য ২ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকাসহ অন্যান্য সম্পদের বিপরীতে রক্ষিতব্য ১৩৭ টাকা সঞ্চিতি আগামী ১০ বছরে মুনাফার বিপরীতে সমন্বয়ের সুযোগ চান। অর্থাৎ ২ হাজার ৫০১ কোটি টাকা সঞ্চিতি ১০ বছরে সমন্বয়ের সুযোগ চাওয়া হয়েছে। ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের ৩৫৭তম সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এ আবেদন করেন ব্যবস্থাপনা পরিচালক।
অনুমোদন দিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এক চিঠিতে জানায়, সার্বিক অবস্থা বিবেচনায় ব্যাংকের আদায় অনিশ্চিত বা শ্রেণীকৃত ২ হাজার ৯৯৯ কোটি টাকা ঋণ ‘শ্রেণীকৃত ব্লকড অ্যাসেট’ হিসেবে স্থানান্তর করে ওই শ্রেণীকৃত ঋণের বিপরীতে রক্ষিতব্য সঞ্চিতি ১ হাজার ৯৩৩ কোটি টাকা ২০১৫ সাল থেকে পরবর্তী ১০ বছর সংরক্ষণের অনুমতি দেয়া হলো। অবশিষ্ট শ্রেণীকৃত ৫ হাজার ১১০ কোটি টাকার বিপরীতে রক্ষিতব্য ২ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকা সঞ্চিতিসহ অন্যান্য সম্পদের বিপরীতে রক্ষিতব্য সঞ্চিতি ১৩৭ কোটি টাকা অর্থাৎ মোট ২ হাজার ৫০১ কোটি টাকা সঞ্চিতি পরবর্তী পাঁচ বছরে সংরক্ষণ করা যাবে। তবে এসব শ্রেণীকৃত ব্লকড অ্যাসেট কোনোভাবেই অশ্রেণীকৃত দেখানো যাবে না।
ব্যাংকটি সিআইবিতে এসব ঋণ শ্রেণীকৃত দেখালেও বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠানো প্রতিবেদনে অশ্রেণীকৃত দেখিয়ে খেলাপি ঋণ কমিয়েছে বলে জানা গেছে।
এসব বিষয়ে জানতে খোন্দকার মো. ইকবালের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তবে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান আলাউদ্দিন এ মজিদ বলেন, অন্য সরকারি ব্যাংকগুলোও এ ধরনের সুবিধা পেয়েছে। আমাদেরও দেয়া হয়েছে। এর বেশি বলতে চাননি তিনি।
Discussion about this post