http://www.ntvbd.com/opinion/19902/%E0%A6%B0%E0%A6%BE%E0%A6%9C%E0%A6%A7%E0%A6%BE%E0%A6%A8%E0%A7%80%E0%A6%B0-%E0%A6%9C%E0%A6%B2%E0%A6%BE%E0%A6%AC%E0%A6%A6%E0%A7%8D%E0%A6%A7%E0%A6%A4%E0%A6%BE
সংসদ ভবনের চারপাশে অথৈ পানি। ধানমণ্ডিতেও কোমর সমান পানি, মতিঝিলে কোনো কোনো ব্যাংক শাখায় পানি, গুলশানেও পানি, কারওয়ান বাজারে সোনারগাঁও হোটেলের সামনেও হাঁটুপানি। এ যেন এক নতুন ঢাকা। অনেকটা এতিম, যেন ঢাকাকে দেখারও কেউ নেই।
অল্প বৃষ্টিতেই ডুবে যায় চট্টগ্রাম, এ চিত্র নতুন নয়। ফলে সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আগে চট্টগ্রামের প্রার্থীদের মতো রাজধানীর উভয় অংশের কোনো প্রার্থীকেই জলাবদ্ধতা নিরসনের জোরালো প্রতিশ্রুতি দিতে হয়নি। কারণ রাজধানীতে অল্প সময়েই এত জলাবদ্ধতা তৈরি হবে তার বাস্তবতা তখনো নজরে আসেনি। ফলে ভাগ্যজোরে একরকম বেঁচেই গেছেন দুই নগরপিতা।
বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা, প্রশাসনিক সব কার্যালয়ের কেদ্রবিন্দুও। ওয়াসা, রাজউক, সিটি করপোরেশন আরো কত প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে এ রাজধানীকে সেবা দিতে। পাশাপাশি দেশের সব সরকারি-বেসরকারি, বিদেশি প্রতিষ্ঠান তো রয়েছেই। এত সব প্রতিষ্ঠানের ‘উন্নয়নের চাপে’ রাজধানীর উন্নয়ন আসলেই থমকে গেছে।
রাজধানীর উন্নয়ন বিশেষত ড্রেনেজ ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নয়নে কত ব্যয় হয়েছে, তার ফিরিস্তি দেওয়া কঠিন। কারণ সরকারি, বেসরকারি, সিটি করপোরেশন, বিদেশি আরো কত প্রতিষ্ঠানই না ব্যয় করছে রাজধানীকে উন্নত করতে।
দৈনিক বণিক বার্তায় প্রকাশিত এক সংবাদে বলা হয়েছে, মাত্র তিন দশক আগেও রাজধানীর ঢাকা ও আশপাশে ৪০টি খাল ছিল। এর মধ্যে বর্তমানে ১২টির অস্তিত্ব থাকলেও ক্রমশ তা ভরাট হচ্ছে। কোনোটি এরই মধ্যে সরু নালায় পরিণত হয়েছে। জলাভূমিগুলোর অবস্থাও একই। আর ঢাকার বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে থাকা নিচুভূমি তথা প্লাবনভূমিগুলোর অস্তিত্বই পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। সব মিলিয়ে সাড়ে তিন দশকে ১০ হাজার হেক্টরের বেশি জলাভূমি, খাল ও নিম্নাঞ্চল হারিয়ে গেছে। এর প্রভাব দেখা যাচ্ছে রাজধানীতে। সামান্য বৃষ্টিতে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। এমনকি গত মঙ্গলবার মাত্র ৪২ মিলিমিটার বৃষ্টিতে রাজধানীর অর্ধেক সড়ক পানিতে ডুবে যায়। ফলে সামান্য বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতার একই চিত্র দেখা যায়।
ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিংয়ের (আইডব্লিউএম) সমীক্ষায় উঠে এসেছে রাজধানীর বিভিন্ন জলাভূমি, নিচুভূমি ও খাল হারিয়ে যাওয়ার চিত্র। এতে বলা হয়, ১৯৭৮ সালে ঢাকা ও আশপাশে বিভিন্ন এলাকায় জলাভূমির পরিমাণ ছিল দুই হাজার ৯৫২ হেক্টর ও নিচুভূমি ১৩ হাজার ৫২৮ হেক্টর। সে সময় ঢাকা ও আশপাশে খাল ও নদী ছিল দুই হাজার ৯০০ হেক্টর। ফলে বৃষ্টির পানি চলে যেত রাজধানীর চারপাশে ছড়িয়ে থাকা খাল ও এরপর নদীতে।
২০১৪ সালে ঢাকা ও আশপাশে জলাভূমি কমে দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৯৩৫ হেক্টর, নিচুভূমি ছয় হাজার ১৯৮ হেক্টর এবং নদী-খাল ১০০২ হেক্টর। অর্থাৎ ৩৫ বছরে জলাশয় কমেছে যথাক্রমে ৩৪ দশমিক ৪৫, ৫৪ দশমিক ১৮ ও ৬৫ দশমিক ৪৫ শতাংশ।
১৯৮৮ সালে ঢাকা ও আশপাশে জলাভূমি ছিল দুই হাজার ১০৪ হেক্টর, নিম্নাঞ্চল ১২ হাজার ৭১৮ হেক্টর এবং নদী ও খাল দুই হাজার পাঁচ হেক্টর। তবে ২০০৯ সালে এগুলোর পরিমাণ কমে দাঁড়ায় যথাক্রমে এক হাজার ৯৯১ হেক্টর, ছয় হাজার ৪১৫ হেক্টর ও এক হাজার ৫৮ হেক্টর। এ প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০৩১ সাল নাগাদ ঢাকায় জলাশয় ও নিচুভূমির মোট পরিমাণ এর আয়তনের ১০ শতাংশের নিচে নেমে যাবে বলে আশঙ্কা করা যায়।
গত মঙ্গলবার বিবিসি বাংলার একটি খবরের শিরোনাম ছিল ‘ঢাকায় প্রবল বৃষ্টিতে ভেসে গেছে ফেসবুক’। এতেই উঠে এসেছে রাজধানীর নতুন চেহারা। টিভি চ্যানেলগুলোতেও জলাবদ্ধ ঢাকার ছবি মানুষ দেখেছে। সেখানে দেখা গেছে রিপোর্টাররা হাঁটুপানিতে নেমে রিপোর্ট করছেন।
রাজধানীর এ চিত্র মানে, সংবাদকর্মীদের হাঁটুপানি পাড়ি দিয়ে সংবাদ প্রচার কি আবারও দেখা মিলবে পরবর্তী কোনো বৃষ্টিতে না কি স্বাভাবিক থাকবে তা নির্ধারণ করতে হবে এখনই। সরকারি কোনো সংস্থার দায়িত্ব পানিনিষ্কাশনের, এমন মত দিয়ে বসে থাকলে হবে না। সমস্যা চিহ্নিত, এবার সমাধানযাত্রা-এমন প্রতিশ্রুতি দিয়ে চেয়ারে বসা দুই সিটি করপোরেশনকেই নিতে হবে এর দায়িত্ব। এর কোনো বিকল্প নেই।
লেখক : সংবাদকর্মী
Discussion about this post