খবরটা এখনো চাপা রয়ে গেছে। তবে অবগত ব্যাংক নির্বাহী ও এর মালিকরা। রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক অস্থিরতার মধ্যেও দেশের ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণ কমে এসেছে। এর পরিমাণ ১০ শতাংশের কম বলেই খবর মিলছে। সবাই তো বলবেন, সুখবর এটি। কিন্তু এখানেই যে শুভঙ্করের ফাঁকি রয়েছে, সেটি কেউ জানছে না। কয়েক বছর ধরে দেশের ব্যাংকিং খাত নানামুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করছে। কয়েকটি আর্থিক কেলেঙ্কারি সংঘটের পর রাজনৈতিক অস্থিরতা এ খাতের পিছু টেনে ধরেছিল। যার প্রমাণ মেলে খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়া, ঋণপ্রবাহ কমে যাওয়াসহ বিভিন্ন সূচকে। তারল্য বেড়ে যাওয়ায় চিন্তায় পড়েছে ব্যাংকগুলো। কয়েকটি ব্যাংক তো বড় ধরনের সংকটেই পড়েছে। গেল বছরের আর্থিক প্রতিবেদন বটে, চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসের প্রতিবেদনেও ব্যাংকের মুনাফা কমে আসার প্রবণতা লক্ষণীয়। কিন্তু হঠাত্ করেই পরিস্থিতি পাল্টে যেতে থাকে। বর্তমানে প্রায় সব ব্যাংকই বেশি সঞ্চিতি সংরক্ষণ করেছে, মূলধনও উদ্বৃত্ত থাকছে। সব সূচকই ‘অস্বাভাবিক’ উন্নতি ঘটিয়েছে দেশের ব্যাংকিং খাতে। হঠাত্ করে এ খাতের এমন উন্নতি প্রশ্নবিদ্ধ হবে বৈকি। দু-তিন মাস আগেই যেখানে প্রতিটি ব্যাংকের সূচকে অবনতি ঘটছিল, সেখানে দ্রুত কীভাবে এত উন্নতি, তাও পর্যালোচনার দাবি রাখে।
চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাস, বিশেষ করে দ্বিতীয় প্রান্তিকে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ব্যাংকগুলোর ঋণ আদায় একেবারেই থমকে ছিল। রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে উত্পাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ায় খেলাপিও হয়ে যায় অনেক বড় প্রতিষ্ঠান। ব্যবসায় স্থবিরতার কারণে ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদে অনুমোদন হওয়ার পরও প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা ঋণ উত্তোলন করেননি গ্রাহকরা। ব্যাংকগুলো আমানতের সুদহার কমিয়ে সঞ্চয়কেও নিরুত্সাহিত করেছে।
রাজনৈতিক অস্থিরতায় ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে ছাড় দেয়ার জন্য কিছু ক্ষেত্রে ঋণ নীতিমালা শিথিলের ঘোষণা দেয় নিয়ন্ত্রক সংস্থা। সেখানে বলা হয়, রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোকে কেস-টু-কেস ভিত্তিতে সুবিধা প্রদান করতে পারবে ব্যাংকগুলো। কেন্দ্রীয় ব্যাংক চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত অর্থাত্ ঋণ শ্রেণীকরণ হওয়ার আগে তা পুনর্গঠন ও ব্যাংকার-গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে ডাউন পেমেন্ট নিরূপণের পরামর্শ দিয়েছে। এতে আরো বলা হয়, প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত ঋণগ্রহীতাদের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখা এবং ঋণ আদায় নিশ্চিত করতে এককালীন নগদ জমা (ডাউন পেমেন্ট) গ্রহণ ও ঋণের মেয়াদকাল নিরূপণের বিষয়টি ব্যাংক গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে বিবেচনা করতে পারবে এবং ঋণ পুনর্গঠনের মেয়াদকাল যৌক্তিক পর্যায়ে নির্ধারণ করা যাবে।
শুধু ক্ষতিগ্রস্তদের এ সুযোগ দেয়ার নির্দেশনা থাকলেও ব্যাংকিং খাতে বছরের পর বছর ধরে অনিয়মিত হয়ে পড়া ঋণ নিয়মিত করার রীতিমতো উত্সব শুরু হয়েছে। অনেক ব্যাংক শাখায় এ-সংক্রান্ত ব্যানারও শোভা পাচ্ছে যেন ‘ঋণ নিয়মিত করার মেলা’। এভাবে ঋণ নিয়মিত করায় গ্রাহক যেমন উপকৃত হচ্ছেন, ঠিক তেমনি ব্যাংকও! খেলাপি ঋণ কমে আসায় ব্যাংকের সঞ্চিতি সংরক্ষণের হারও কমে আসছে। এভাবে কৌশলে বেশি মুনাফা করার সুযোগ পেয়েছে ব্যাংকগুলো।
২০১৩ সালের সেপ্টেম্বরে ১২ দশমিক ৭৯ শতাংশ অর্থাত্ ৫৬ হাজার ৭২০ কোটি টাকা খেলাপি থাকলেও ডিসেম্বর তা কমে দাঁড়িয়েছে ১০ শতাংশের নীচে। প্রায় সব ব্যাংকেরই মূলধন উদ্বৃত্ত এখন। এটা নিশ্চয়ই খুশির খবর। ব্যাংকগুলোর বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদনে এর প্রতিফলন দেখা যাবে বৈকি। এটি ফলাও করে প্রচারও করা হবে হয়তো। প্রশ্ন হলো, এভাবে সূচকে উন্নতি ঘটিয়ে কী লাভ? এতে অবশ্য ব্যাংকগুলোর মুনাফা বাড়বে। কিন্তু ব্যাংকের প্রকৃত অবস্থা বোঝা যাবে না। ফলে কোনো ধরনের সংস্কার কার্যক্রমও হাতে নেয়া হবে না। এটি দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থার জন্য কতটা শুভ, তা ভেবে দেখার অনুরোধ জানাতে হবে।
সদ্যবিদায়ী একটি ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীর ভাষায়, ‘সূচকে উন্নতি হয়েছে শাক দিয়ে মাছ ঢাকার মাধ্যমে; যার মাশুল নির্দিষ্ট সময় পর দিতে হবে কয়েক গুণ। এটি করা হচ্ছে কৃত্রিমভাবে।’ সূচকের এ কৃত্রিম উন্নতি কতটা সুখকর হবে, তা সময়ই বলে দেবে। এক্ষেত্রে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারক ব্যবস্থা আরো জোরদার করতে হবে। আর্থিক খাতে সংঘটিত কেলেঙ্কারিসহ সম্প্রতি সৃষ্ট সমস্যা সমাধানে ব্যাংকিং খাতে সংস্কারের উদ্যোগ নেয়াও প্রয়োজন।
– See more at: http://bonikbarta.com/sub-editorial/2014/02/16/32231#sthash.e1j91G2s.KaMR6E3K.dpuf
Discussion about this post