চট্টগ্রামভিত্তিক সিলভিয়া গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান মিশম্যাক শিপ ব্রেকিং ইন্ডাস্ট্রিজ। মার্কেন্টাইল ব্যাংকের আগ্রাবাদ শাখা নিয়ম ভেঙে ঋণ সুবিধা দেয় প্রতিষ্ঠানটিকে। বছর দুয়েক আগে এক পরিদর্শনে ওই অনিয়ম ধরা পড়লে এসব ঋণ খেলাপি করে দায়ী কর্মকর্তাদের শাস্তির নির্দেশ দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কিন্তু মার্কেন্টাইল ব্যাংক ওই প্রতিষ্ঠানকে খেলাপি তো করেইনি, বরং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে তথ্য গোপন করে ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ থেকে ঋণ পুনঃতফসিল করেছে।
শুধু মার্কেন্টাইল নয়, আরো বেশ কয়েকটি ব্যাংক থেকে এভাবেই বিধিবহির্ভূতভাবে সিলভিয়া গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে প্রায় ৯০০ কোটি টাকা নিয়ে দেশ ছেড়েছেন গ্রুপটির কর্ণধার হুমায়ুন কবির, মিজানুর রহমান শাহিন ও মজিবুর রহমান মিলন। সম্পর্কে তারা তিন ভাই। সম্প্রতি গ্রুপটির বিভিন্ন অঙ্গপ্রতিষ্ঠানের ঋণ অনুসন্ধান করে অনিয়ম পাওয়ায় ও তা আদায়ের সম্ভাবনা না থাকায় এসব ঋণ খেলাপি করার নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের টাস্কফোর্সের নিয়মিত সভায় বিষয়টি অবহিত করা হয়।
সিলভিয়া গ্রুপের প্রায় ৯০০ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে আছে— মার্কেন্টাইল ব্যাংকের ২৯৯ কোটি, ব্যাংক এশিয়ার ১৪০ কোটি, অগ্রণী ব্যাংকের ১২৪ কোটি, ঢাকা ব্যাংকের ১৪৫ কোটি, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের ৮৯ কোটি, ইস্টার্ন ব্যাংকের ৪৮ কোটি ও প্রিমিয়ার ব্যাংকের ৪৩ কোটি টাকা। অনিয়ম আড়াল করতে তড়িঘড়ি করে কিছু ঋণ এরই মধ্যে অবলোপনও করেছে ব্যাংকগুলো।
জানতে চাইলে অগ্রণী ব্যাংকের এমডি সৈয়দ আবদুল হামিদ বলেন, ‘তাদের কিছু ঋণ অবলোপন করা হয়েছে। বাকি সব ঋণ শ্রেণীকৃত করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা আমরা পেয়েছি। তার বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াধীন আছে।’
এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কেউ মন্তব্য করতে রাজি হননি এবং দেশে না থাকায় সিলভিয়া গ্রুপের কর্ণধারদের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি।
তবে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নাজমুস সালেহীন বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা পাওয়ার পর আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি। ওই পক্ষও উদ্যোগী হয়ে এগিয়ে আসছে। আশা করছি, ডিসেম্বরের মধ্যেই ভালো কিছু হবে।
সাতটি ব্যাংক থেকে পাওয়া নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, মার্কেন্টাইল ব্যাংকের আগ্রাবাদ শাখা থেকে সিলভিয়া গ্রুপকে এর অঙ্গপ্রতিষ্ঠান সানমার হোটেল নির্মাণের জন্য দুই দফায় অর্থায়ন করা হয়। ব্যাংকটির নির্বাহী কমিটি ২০১০ সালের ২১ আগস্ট ১০ বছর মেয়াদে ৬৫ কোটি টাকার ঋণ অনুমোদন করে।
এর পর গ্রাহক অন্য মেয়াদি ঋণের ৬ কোটি ও সহযোগী প্রতিষ্ঠান ফয়জুন শিপ ব্রেকিংয়ের ৪৮ কোটি টাকা পরিশোধের জন্য দ্রুত ঋণ ছাড়ের আবেদন করলে ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয় জানিয়ে দেয়, ‘ব্যাংকের ঋণ দিয়ে আগের ঋণ শোধ করা যাবে না, যে উদ্দেশ্যে ঋণ দেয়া হয়েছে সে কাজেই ব্যবহার করতে হবে।’ কিন্তু শাখা কর্তৃপক্ষ ঋণের ৫৫ কোটি টাকা ঋণ পরিশোধে ব্যবহার করার সুযোগ দেয়। ব্যাংকের শাখাটিতে সানমার হোটেল ও ফয়জুন শিপ ব্রেকিংয়ের ১০৬ কোটি টাকা শ্রেণীকৃত হলেও নিয়মিত দেখানো হচ্ছে। মার্কেন্টাইল ব্যাংকের একই শাখা থেকে সিলভিয়া গ্রুপের আরেক অঙ্গপ্রতিষ্ঠান মুহিব স্টিল অ্যান্ড শিপ রিসাইক্লিংয়ের জন্য একই দিন হিসাব খোলার আবেদনের পাশাপাশি ঋণ প্রস্তাব প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। প্রধান কার্যালয় ২০১১ সালের ২৯ মে ঋণ মঞ্জুর করে। কিন্তু মূলত এর আগেই ১০ মে গ্রাহককে ২৭ কোটি টাকার ঋণ সুবিধা দেয়া হয়। সব মিলিয়ে মার্কেন্টাইলের আগ্রাবাদ শাখায় মিশম্যাক শিপ ব্রেকিংয়ের দেনা ১৭১ কোটি টাকা। এসব ঋণখেলাপি করার নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
এদিকে ব্যাংক এশিয়ার চট্টগ্রামের সিডিএ এভিনিউ শাখা থেকে মিশম্যাক শিপ ব্রেকিং জাহাজ আমদানির জন্য ঋণ সুবিধা নিলেও তা পরিশোধ করেনি। ফলে তাদের ১১ কোটি টাকা খেলাপি হয়ে গেছে। এছাড়া একই গ্রুপের আহমেদ মোস্তফা স্টিলের অবলোপনকৃত ২২ কোটি টাকাও আদায়ের নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সেই সঙ্গে এমআর শিপিং লাইনের বকেয়া ১০৭ কোটি টাকা খেলাপি করারও নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, অগ্রণী ব্যাংকের লালদীঘি ইস্ট করপোরেট শাখা থেকে সিলভিয়া গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান মুহিব স্টিল অ্যান্ড শিপ রিসাইক্লিংকে ভুয়া বিল তৈরি ব্যাংকের অর্থ সরিয়ে নিতে সহায়তা করেছেন কর্মকর্তারা। এ অবস্থায় প্রতিষ্ঠানের অবলোপনকৃত ৯২ কোটি টাকা আদায়ের তাগিদ দেয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে মিশপ্যাক শিপ ব্রেকিংয়ের বকেয়া ৩১ কোটি খেলাপি করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
অন্যদিকে প্রিমিয়ার ব্যাংকের আগ্রাবাদ শাখা থেকে ১০ কোটি টাকা ঋণ অনুমোদিত হলেও ২০ কোটি টাকার ঋণ সুবিধা প্রদান করা হয়েছে। এজন্য শাখা ব্যবস্থাপক এককভাবে দায়ী বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। ব্যাংকটিতে থাকা ৪৩ কোটি টাকা খেলাপি করার নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
এভাবে নিয়ম ভেঙে ঢাকা ব্যাংকের মুরাদপুর ইসলামী ব্যাংকিং শাখা থেকে ১৪৫ কোটি ঋণ সুবিধা নিয়েছে সিলভিয়া গ্রুপের বিআর স্টিল, ফয়জুন অক্সিজেন প্লান্ট, ফয়জুন এসিথিলেন প্লান্ট, আহমেদ মোস্তফা স্টিল। স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের জুবিলী রোড শাখা থেকে ফয়জুন শিপ ব্রেকিং ও মুহিব স্টিল নিয়েছে ৮৯ কোটি টাকা। ইস্টার্ন ব্যাংক থেকে আহমেদ মোস্তফা স্টিল নিয়েছে ৪৮ কোটি টাকা। সবগুলো ঋণই খেলাপি করার নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
Discussion about this post