ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ায় উদ্বিগ্ন বাংলাদেশ ব্যাংক। যে কোনো মূল্যেই তা কমিয়ে আনতে চাইছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ডিসেম্বরের মধ্যেই খেলাপি ঋণ ১০ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনতে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের (এমডি) নির্দেশনাও দেয়া হয়েছে। এতে চাপের মধ্যে পড়েছেন খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়া ব্যাংকের এমডিরা। খেলাপি ঋণ আছে, এমন বেশকিছু বড় গ্রুপের সঙ্গে এরই মধ্যে আলোচনাও শুরু করেছেন তারা।
শৃঙ্খলার অভাব ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে সম্প্রতি ব্যাংকিং খাতে বেশকিছু অনিয়ম সংঘটিত হয়। সোনালী ব্যাংক থেকে ৪ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করে হল-মার্কসহ ছয়টি গ্রুপ। কয়েকটি ব্যাংক থেকে বিসমিল্লাহ গ্রুপ আত্মসাৎ করে ১ হাজার কোটি টাকার বেশি। এসব আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনায় আস্থার সংকটে পড়ে পুরো ব্যাংকিং খাত। খেলাপি ঋণ, সম্পদ থেকে মুনাফা ও বিনিয়োগ থেকে মুনাফা— সব সূচকই অবনতির দিকে যায়।
http://www.bonikbarta.com/2014-12-18/news/details/22801.html
গত বছরের রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ঋণ নীতিমালায় ছাড় দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বিশেষ বিবেচনায় নিয়মিত করা হয় খেলাপি ঋণ। তবে সে ঋণও আবার খেলাপি হয়ে পড়ছে। ফলে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে মোট বিতরণ করা ঋণের ১১ দশমিক ৬ শতাংশ। এরই পরিপ্রেক্ষিতে সম্প্রতি কয়েকটি ব্যাংকের এমডিকে ডেকে খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনার লক্ষ্য বেঁধে দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। গত সোমবার ব্যাংকার্স সভায়ও শ্রেণীকৃত ঋণের পরিমাণ ও হার— দুটোই কমিয়ে আনতে এমডিদের নির্দেশ দেন গভর্নর ড. আতিউর রহমান। তবে বড় গ্রুপগুলো বিশেষ সুবিধা পাবে বলে সভায় জানানো হয়। এর পরই বেক্সিমকো, মোস্তফা, নুরজাহান, এইচআর, আল আমিনসহ কয়েকটি গ্রুপের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের এমডিরা।
জানতে চাইলে আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের এমডি মো. হাবিবুর রহমান বলেন, ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনতে বলা হয়েছে। বড় গ্রুপগুলোর ক্ষেত্রে আমরা প্রস্তাব করলে নীতিমালা নমনীয় করে পুনঃতফসিলের সুযোগ দেয়ার আশ্বাস দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। খেলাপি হয়ে পড়া বড় গ্রুপগুলোর ব্যাপারে ব্যাংকগুলোকে সম্মিলিত উদ্যোগ নিতে হবে।’
সর্বশেষ ব্যাংকার্স সভায়ও বড় কয়েকটি গ্রুপের ঋণ নিয়ে আলোচনা হয়। বড় যেসব গ্রুপের কাছে কয়েকটি ব্যাংকের হাজার কোটি টাকার বেশি আটকে গেছে, তা নিয়মিত করার কথা বলা হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে বলা হয়, মোস্তফা গ্রুপকে ৩০টি ব্যাংক প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা অর্থায়ন করেছে। শুধু ইস্টার্ন ব্যাংক বিশেষ সুবিধায় গ্রুপটির ঋণ নিয়মিত করার প্রস্তাব দিয়েছে। তবে পুরো গ্রুপের ঋণ কীভাবে নিয়মিত করা যায়, সব ব্যাংককে একসঙ্গে সে প্রস্তাব দিতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, বিশেষ ছাড়ে খেলাপি ঋণ কমালে সাময়িক ক্ষত হয়তো কেটে যাবে। কিন্তু তা টেকসই হবে না। নতুন করে কোনো ঋণ যাতে খেলাপি না হয়, সেদিকে বেশি নজর রাখতে হবে। তবে সবার আগে চিহ্নিত করতে হবে সমস্যাটা কী? ব্যাংকের সুশাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে পারলেই অনেক সমস্যা কেটে যাবে।
ঋণ নীতিমালা শিথিলের কারণে ২০১৩ সালের শেষ তিন মাসে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) খেলাপি ঋণ কমে আসে ১৬ হাজার কোটি টাকায়। গত বছরের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণ দাঁড়ায় ৪০ হাজার ৫৮৩ কোটি টাকা, যা বিতরণ করা ঋণের ৮ দশমিক ৯৩ শতাংশ। তবে বিশেষ বিবেচনায় নিয়মিত করা ঋণও আবার খেলাপি হতে থাকে। চলতি বছরের মার্চ শেষে ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়ায় ৪৮ হাজার ১৭২ কোটি টাকা; বিতরণ করা মোট ঋণের যা ১০ দশমিক ৪৫ শতাংশ। জুন শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ আরো বেড়ে দাঁড়ায় ৫১ হাজার ৩৪৪ কোটি টাকায়। আর চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৫৭ হাজার ২৯০ কোটি টাকা; মোট ঋণের যা ১১ দশমিক ৬ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, যেসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণ গত ছয় মাসে বেশি বেড়েছে, বিশেষ তদারকির মধ্যে রাখা হয়েছে সেগুলো। ব্যাংকগুলোকে খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনার জন্য বলা হচ্ছে। পুরনো অনাদায়ী ঋণ অবলোপন ও খেলাপি ঋণ নিয়মিত করে শ্রেণীকৃত ঋণের পরিমাণ কমিয়ে আনতে বলা হচ্ছে। বড় গ্রুপ ও বড় ঋণের ক্ষেত্রে বিশেষ ছাড়ে অবলোপন ও নিয়মিত করার নির্দেশনা রয়েছে। এর মাধ্যমেই ডিসেম্বরের মধ্যে খেলাপি ঋণ ১০ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনা সম্ভব হবে। খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনতে সম্প্রতি প্রিমিয়ার, ন্যাশনাল, বেসিক, কৃষি, সোনালী, রূপালী, জনতা, অগ্রণীসহ কয়েকটি ব্যাংককে পৃথকভাবে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
গত সোমবারের ব্যাংকার্স সভায় ডিসেম্বরের মধ্যে খেলাপি ঋণ ১০ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনার নির্দেশ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। যদিও বেসরকারি ব্যাংকের এমডিরা বলছেন, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর কারণেই খেলাপি ঋণ বেশি হচ্ছে। বেসরকারি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ সর্বোচ্চ ৬ দশমিক ৩৪ শতাংশ। অথচ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে এর গড় হার ২৩ দশমিক ৯২ শতাংশ পর্যন্ত। আর রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ ৩৭ দশমিক ৮৪ শতাংশ। তাই রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো উদ্যোগ নিলেই খেলাপি ঋণ কমে আসবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠানো ব্যাংকগুলোর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে বেসিক ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১ হাজার ৫৫৮ কোটি টাকা। একই সময়ে ইসলামী ব্যাংকের বেড়েছে ৬৭৬ কোটি, জনতার ৪০৪ কোটি, সোনালীর ৪০০ কোটি, প্রাইমের ৩১০ কোটি, অগ্রণীর ২৯০ কোটি, পূবালীর ২৫৬ কোটি, মার্কেন্টাইলের ২৪৮ কোটি, সাউথইস্টের ২১৮ কোটি ও ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের ২০০ কোটি টাকা।
Discussion about this post