অকৃষি বাণিজ্যে বড় অঙ্কের ঋণ দিয়েছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক (বিকেবি)। অধিক মুনাফার আশায় দেয়া এ ঋণ এখন ক্ষতিজনক মানে শ্রেণীকৃত হয়ে গেছে, যা নাজুক অবস্থায় ফেলে দিয়েছে ব্যাংকটিকে। বর্তমানে কৃষি ব্যাংকের সমন্বিত মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকার বেশি। বেড়েছে লোকসানের অঙ্কও। ২০১৪ সালে এর পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৮৫ কোটি টাকা।
কৃষি ব্যাংকের এ অবস্থার জন্য দায়ী বেশকিছু কারণ চিহ্নিত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে কৃষির বাইরে অর্থায়নের ঘটনা যেমন রয়েছে, একই সঙ্গে রয়েছে ঋণ বিতরণে অনিয়মও। ব্যাংক কোম্পানি আইন লঙ্ঘন করে শ্রেণীকৃত ঋণ থাকা সত্ত্বেও অর্থায়ন করা হয়েছে। ঋণের বিপরীতে রাখা হয়নি সহায়ক জামানতও।
এসব অনিয়মের ফলে ২০১৪ সালে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৭২ কোটি টাকা, বিতরণ করা ঋণের যা ৩২ দশমিক ৯৪ শতাংশ। খেলাপি ঋণের এ হার বেসিক ব্যাংকের পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। এ সময়ে কৃষি ব্যাংকের সঞ্চিতি ঘাটতির পরিমাণ ২ হাজার ৭৪ কোটি টাকা। আর ১৮৫ কোটি টাকা লোকসান নিয়ে ব্যাংকটির সমন্বিত মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৬৪৩ কোটি টাকা। এ ঘাটতি পূরণে সরকারের কাছে সম্প্রতি আবেদন করেছে ব্যাংকটি।
গত বছরের ২৯ অক্টোবর বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হিসেবে যোগ দিয়েছেন এমএ ইউসুফ। যোগাযোগ করা হলে বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘যারা কৃষিঋণের পরিবর্তে অন্য খাতে অর্থায়ন করে চলে গেছেন, তাদের বিচারের বিষয়টি ভিন্ন। তবে ব্যাংকের কারো বিরুদ্ধে অনিয়মে জড়িত থাকার প্রমাণ মিললে ছাড় দেয়া হচ্ছে না। শাস্তির আওতায় আনা হচ্ছে। কৃষি ব্যাংকে যোগদানের পর থেকেই অর্থ আদায়ের চেষ্টা করে যাচ্ছি। এজন্য অঞ্চলভিত্তিক পৃথক কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দিয়ে তদারক করা হচ্ছে। এসব কাজ ঠিকমতো চললেও কমপক্ষে দুই বছর লাগবে ব্যাংকটিকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে।’
বড় গ্রাহকদের মধ্যে কেয়া ইয়ার্ন মিলসকে ১৩৫ কোটি টাকা অর্থায়ন করেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক। এছাড়া ফিয়াজ এন্টারপ্রাইজকে দেয়া হয়েছে ১২৩ কোটি, অনিকা এন্টারপ্রাইজকে ১০১ কোটি, আব্বাস ট্রেডিংকে ৩১ কোটি এবং এনএ করপোরেশনকে ২৮ কোটি টাকার ঋণ। সব ঋণই ক্ষতিজনক মানে শ্রেণীকৃত হয়ে গেছে।
ব্যাংকটির সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, শীর্ষ ২০ ঋণগ্রহীতার কাছে ব্যাংকটির পাওনা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৬৭৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে বড় অংশের ঋণই খেলাপি হয়ে গেছে। কৃষিঋণের বদলে বৈদেশিক বাণিজ্য ও নগদ অর্থায়নই সংকটে ফেলে দিয়েছে বিশেষায়িত ব্যাংকটিকে।
ব্যাংকটির গ্রাহকদের নিয়মবহির্ভূত নানা সুবিধা দেয়ার চিত্র উঠে এসেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে। ব্যাংকের কারওয়ান বাজার করপোরেট শাখা পরিদর্শনে দেখা গেছে, মেসার্স ফেয়ার ইয়ার্ন প্রসেসিংকে শাখাটি থেকে ৪২০ কোটি টাকা ঋণ সুবিধা দেয়া হয়েছে। এর বিপরীতে যে পরিমাণ সহায়ক জামানত রাখা হয়েছে তা দিয়ে ৫০ কোটি টাকার ফান্ডেড ঋণ সুবিধা (সিসি, এলটিআর) আবৃত করা হয়েছে। নন-ফান্ডেড ঋণ (ডেফার্ড এলসি ও সাইট এলসি) ২৬০ কোটি টাকা সুবিধার বিপরীতে কোনো ধরনের জামানত নেয়া হয়নি। এক্ষেত্রে শাখা ও প্রধান কার্যালয় কোনো পর্যায়েই নিয়ম-কানুন মানা হয়নি বলে মনে করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এছাড়া নীতিমালা উপেক্ষা করে ঋণপত্র স্থাপন, বিল অব এক্সচেঞ্জ/এলটিআর সৃষ্টি, অনাদায়ী ঋণ নির্দিষ্ট মানে শ্রেণীকৃত না করার মতো সুবিধা দেয়া হয়েছে এসমা গ্রুপ, প্যারাগন গ্রুপ, মেসার্স ফিয়াজ এন্টারপ্রাইজ ও ডিএনএস গার্মেন্টসকে। প্রতিষ্ঠানগুলো এসব সুবিধা পেয়েছে বনানী করপোরেট শাখা থেকে।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর এসকে সুর চৌধুরী বলেন, ‘গত কয়েক বছরে বৈদেশিক বাণিজ্যে অর্থায়নের ফলে ব্যাংকটির আর্থিক অবস্থার চরম অবনতি হয়েছে। বাধ্য হয়ে ব্যাংকটি সংস্কারে আমরা উদ্যোগ নিয়েছি। বিশেষ করে বড় রকমের মূলধন ঘাটতি পূরণসহ সূচকগুলো উন্নতির চেষ্টা করা হচ্ছে।’
বাংলাদেশ ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদের ৩৫২তম সভায় কৃষি ব্যাংকের বিষয়টি আলোচনায় আসে। দরিদ্র কৃষকরা ঋণ পাচ্ছেন কিনা, তা খতিয়ে দেখার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয় সভায়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কৃষি ব্যাংকে বিশেষ পরিদর্শন চালায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
২০১৩ ভিত্তিতে কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের তথ্যে দেখা যায়, ৩৪ লাখ ৯ হাজার ৩৬৩ ঋণগ্রহীতার মধ্যে ৩ লাখ ৬৩ হাজার ২২৬ জন হতদরিদ্র কৃষক, যা ঋণগ্রহীতার ১০ দশমিক ৬৫ শতাংশ। আর বিতরণ করা ঋণের দশমিক ৯১ শতাংশ।
পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়, কৃষি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের বেশির ভাগই বৈদেশিক বাণিজ্য ও অকৃষি খাতে প্রদত্ত। ব্যাংকটি গ্রামীণ কৃষিতে অর্থায়নের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত হলেও বেশি মুনাফার আশায় অকৃষি বাণিজ্যিক ও বৈদেশিক বাণিজ্যে অর্থায়ন করেছে। এতে খেলাপি ঋণের পাশাপাশি পুঞ্জীভূত ক্ষতি বাড়ছে। ব্যাংকটি প্রতিষ্ঠাকালে চার্টারে বিধৃত কর্মপরিধি-বহির্ভূত কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের ফলে মূল কাজ থেকে দূরে সরে গেছে।
এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ৯ ডিসেম্বর অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে কৃষি ব্যাংক অর্ডারের মধ্যে থেকে ব্যাংকটিকে কার্যক্রম চালানোর নির্দেশনা দেয়া হয়। অকৃষি বাণিজ্যিক খাতে ঋণ বিতরণে নিরুত্সাহিত করে কেবল কৃষিসংশ্লিষ্ট সেবা/পণ্যের মধ্যে সীমিত রাখা এবং এসব ঋণ কার্যক্রমে অধিকতর সতর্কতা অবলম্বনের কথাও বলা হয় নির্দেশনায়।
এমএ ইউসুফ এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘ব্যাংকটিতে আগে যা হয়েছে, তা আর হবে না। কৃষির বাইরে সব ধরনের ঋণ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।
Discussion about this post