ঋণ অনিয়মে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে একজন ডিএমডিসহ ছয় কর্মকর্তাকে গত বছর সাময়িক বরখাস্ত করে বেসিক ব্যাংক। ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের প্রধান শাখার তত্কালীন ব্যবস্থাপক ও মহাব্যবস্থাপক জয়নুল আবেদীন চৌধুরীও ছিলেন সে তালিকায়। তাকেই এবার ফিরিয়ে এনে প্রধান কার্যালয়ে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। আরো কয়েকজন ফেরার অপেক্ষায় আছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
ব্যাংকটির জনবল নিয়োগে অনিয়মের সঙ্গে যেসব কর্মকর্তার নাম বাংলাদেশ কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেলের (সিএজি) বাণিজ্যিক অডিট অধিদফতরের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, তাদেরও বেশির ভাগই এখনো বহাল রয়েছেন। বরখাস্ত কর্মকর্তাদের ফিরিয়ে আনায় এবং অভিযুক্তদের বহাল রাখায় ক্ষোভ বিরাজ করছে ব্যাংকটির অন্য কর্মকর্তাদের মধ্যে।
সূত্রমতে, বেসিক ব্যাংকে অনিয়মের ঘটনায় ২০১৪ সালের ১৫ এপ্রিল উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) মোনায়েম খান, মহাব্যবস্থাপক খোন্দকার শামীম হাসান, জয়নুল আবেদীন চৌধুরী, মোহাম্মদ আলী, উপমহাব্যবস্থাপক শেফার আহমেদ ও ডেপুটি ম্যানেজার জাহিদ হাসানকে সাময়িক বরখাস্ত করে তত্কালীন পরিচালনা পর্ষদ। তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে অনিয়মে জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পায় ব্যাংক। তবে বরখাস্ত হওয়া মহাব্যবস্থাপক জয়নুল আবেদীন চৌধুরীকে এরই মধ্যে ফিরিয়ে এনে প্রধান কার্যালয়ে কয়েকটি বিভাগের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। ব্যাংকটির শিল্পঋণ বিভাগের দায়িত্বও পেয়েছেন তিনি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব ড. এম আসলাম আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘তদন্তে কেউ দোষী সাব্যস্ত না হলে তিনি ফিরে আসতে পারেন। তার পরও বিষয়টি যাচাই করে দেখা হবে।’
ব্যাংকটির কয়েকটি প্রতিবেদনে দেখা গেছে, নিয়ম ভেঙে নীল সাগর এগ্রো, বর্ষণ এগ্রো, আজবীহা এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ, তেরমা ইঞ্জিনিয়ারিংকে প্রায় ৩৫০ কোটি টাকা ঋণ দেয় বেসিক ব্যাংকের প্রধান শাখা। ওই সময় শাখার ব্যবস্থাপক ছিলেন জয়নুল আবেদীন চৌধুরী। এসব প্রতিষ্ঠানের মালিকের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কের সুবাদেই এ অর্থায়ন করা হয়; যার পুরোটাই এখন খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। কিছু ঋণ ব্লক হিসাবেও স্থানান্তর করেছে ব্যাংকটি।
এদিকে বেসিক ব্যাংকের জনবল নিয়োগে অনিয়মের বিষয়টি উঠে এসেছে সিএজির বাণিজ্যিক অডিট অধিদফতরের নিরীক্ষা প্রতিবেদনেও। অনিয়মে জড়িত হিসেবে নাম এলেও উপব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলুস সোবহান ও রুহুল আলম বর্তমানে ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পর্ষদের প্রভাবশালী কর্মকর্তা। নিয়োগ অনিয়মে জড়িত মহাব্যবস্থাপক রওশানুল আলমও বহাল রয়েছেন। রাজধানীর বাইরে বদলি করা হলেও বর্তমানে বংশাল শাখার ব্যবস্থাপকের দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। এছাড়া ব্যাংকটির কেরানীগঞ্জ শাখায় দায়িত্ব পালন করছেন সহকারী মহাব্যবস্থাপক আনিসুজ্জামানও।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান আলাউদ্দিন এ মজিদ বলেন, অডিট আপত্তি এলে নিয়মানুযায়ী নিষ্পত্তি করা হবে।
ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘জয়নুল আবেদীনের দোষ প্রমাণ না হওয়ায় সাময়িক বরখাস্ত আদেশ প্রত্যাহার করা হয়ছে। সিএজির প্রতিবেদনে যাদের নাম এসেছে, তাদের বিষয়টিও তদন্তসাপেক্ষে নিষ্পত্তি করা হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। তারা নিজেদের নির্দোষ প্রমাণ করতে না পারলে শাস্তি পেতে হবে।’
২০১২ ও ২০১৩ সালে বেসিক ব্যাংকের শান্তিনগর, গুলশান, দিলকুশা ও প্রধান শাখা থেকে অনিয়মের মাধ্যমে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা বের করে নেয় কয়েকটি অখ্যাত গ্রুপ। এ ঘটনার পর কেন্দ্রীয় ব্যাংক তদন্ত করে আরো ভয়াবহ চিত্র পায়। সমঝোতা স্মারক, পর্যবেক্ষক নিয়োগের পরও অনিয়ম চলতে থাকে ব্যাংকটিতে। ব্যাংকটিতে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা অনিয়মের ঘটনায় ২০১৪ সালের ২৫ মে এমডি কাজী ফখরুল ইসলামকে অপসারণের পর ২৯ মে ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেয়ার সুপারিশ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চিঠিতে বলা হয়, আর্থিক অনিয়মের দায় পরিচালনা পর্ষদ এড়াতে পারে না। তাই এ পর্ষদের বিরুদ্ধে ব্যাংক কোম্পানি আইনের ৪৬ ও ৪৭ ধারা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়ার অনুরোধ জানানো হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেন। পরে নতুন পর্ষদ গঠন ও এমডি নিয়োগ দেয়া হয়।
এছাড়া নিয়মনীতি না মেনেই ব্যাংকটিতে অতিরিক্ত জনবল নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এ অনিয়মে জড়িত ছিলেন ব্যাংকের তত্কালীন চেয়ারম্যান
আবদুল হাই বাচ্চুসহ কয়েকজন কর্মকর্তা। জনবল নিয়োগে অনিয়মের বিষয়টি উঠে এসেছে সিএজির বাণিজ্যিক অডিট অধিদফতরের নিরীক্ষায়ও।
বেসিক ব্যাংকের সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৯ সালে ব্যাংকটির জনবল ছিল ৭৭৬ জন। ২০১০ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৯৬৪ জনে। এর পর ২০১১ সালে জনবল আরো বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ১৩২, ২০১২ সালে ১ হাজার ৬৫৭, ২০১৩ সালে ২ হাজার ১৪৫ ও ২০১৪ সালে ২ হাজার ২৩৭ জনে।
Discussion about this post