ইসলামী ব্যাংকের ১৩ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীর নাম, ঠিকানাসহ বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করেছে পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি)। চলতি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে এসবির একজন অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শকের নেতৃত্বে ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয় থেকে এসব নথি সংগ্রহ করা হয়। এর পর থেকেই আতঙ্কে ভুগছেন ব্যাংকটির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
পুলিশ ও ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, চলতি মাসের শুরুতে পুলিশের বিশেষ শাখার অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক ইসলামী ব্যাংকে ফোন করে সব কর্মীর নাম, ঠিকানাসহ বিস্তারিত বিবরণী চান। সে অনুযায়ী পরে বিশেষ শাখার পাঁচ-ছয়জন কর্মকর্তা ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে গিয়ে বিবরণী সংগ্রহ করেন। ব্যাংকটি ১৩ হাজারের বেশি কর্মীর নথিপত্র তুলে দেয় এসবি কর্মকর্তাদের হাতে। এসব নথিপত্রের অনুলিপি পরে পুলিশের সব থানায় হস্তান্তর করা হয়।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) একেএম শহীদুল হক বলেন, ইসলামী ব্যাংক থেকে নথি সংগ্রহের কোনো খবর তার জানা নেই।
তবে নথি সংগ্রহের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মুস্তাফা আনোয়ার। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু কর্মকর্তা এসে সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর তালিকা ও বিস্তারিত বিবরণী চাইলে আমরা তা সরবরাহ করেছি। এর পর থেকেই তাদের স্থায়ী ঠিকানায় গিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে বলে প্রধান কার্যালয়ে অভিযোগ আসছে। আমাদের ব্যবস্থাপনা পর্ষদ শিগগিরই বিষয়টি কেন্দ্রীয় ব্যাংককে জানাবে।
হয়রানির বিষয়টি জানান ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের কর্মকর্তারাও। তারা বলেন, নথি সংগ্রহ করার পরই তাদের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে হয়রানির অভিযোগ আসছে। পাশাপাশি তাদের স্থানীয় রাজনৈতিক মামলায় জড়ানোরও হুমকি দেয়া হচ্ছে।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে ফরিদপুরের কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সৈয়দ মহসিনুল ইসলাম বলেন, পুলিশ হেডকোয়ার্টার থেকে কোনো নথিপত্র এলে সেগুলো দেখার দায়িত্ব আমরা উপপরিদর্শকদের ওপর দিই। এক্ষেত্রেও তা-ই হয়ে থাকতে পারে।
ইসলামী ব্যাংক কক্সবাজার শাখার একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, কক্সবাজার সদর মডেল থানার এক উপপরিদর্শক (এসআই) ব্যাংকের কর্মকর্তাদের টেলিফোন করে তাদের ভোটার আইডি কার্ড, জন্মনিবন্ধন সনদ, নিয়োগপত্র, বর্তমানে কোন শাখায় কর্মরত এবং এক কপি পাসপোর্ট সাইজের ছবিসহ আজ সকাল ১০টার মধ্যে কক্সবাজার সদর মডেল থানায় উপস্থিত হতে বলা হয়েছে।
কক্সবাজার সদর মডেল থানার ওসি কাজী মতিউল ইসলামের সঙ্গে এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে বিষয়টি তার জানা নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তথ্যমতে, ইসলামী ব্যাংকে বর্তমানে কর্মরত ১৩ হাজারের বেশি কর্মকর্তা-কর্মচারী। ২০১৪ সালে ব্যাংকটি বেতন-ভাতা বাবদ পরিশোধ করে ৮১০ কোটি টাকা। ২০১৩ সালে পরিশোধ করেছিল ৭১৩ কোটি টাকা।
ইসলামী ব্যাংকের দুজন কর্মকর্তা ব্যাংকটির ফাউন্ডেশন প্রশিক্ষণার্থীদের ওপর জরিপ চালিয়ে দেখিয়েছেন, ব্যাংকটিতে যোগ দেয়া ৭৪ শতাংশ কর্মকর্তা-কর্মচারী এসেছেন সাধারণ শিক্ষা থেকে। ৭ শতাংশ এসেছেন মাদ্রাসা ও ২০ শতাংশ সাধারণ ও মাদ্রাসার সমন্বিত শাখা থেকে। কর্মকর্তাদের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন ৪৪ শতাংশ কর্মী। একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন ইসলামী ব্যাংকে যোগদানকারী ৪১ শতাংশ কর্মী। এছাড়া ব্যাংকে যোগদানকারীদের মধ্যে ৭৭ শতাংশ ইসলামী ব্যাংকিং পছন্দ করেন। ১৮ শতাংশ চাকরির প্রয়োজনে ব্যাংকে যোগ দিয়েছেন। আর আকর্ষণীয় বেতন-ভাতা ও অন্যান্য কারণে এসেছেন ১ শতাংশেরও কম চাকরিজীবী।
১৯৮৩ সালের ১৩ মার্চ দেশী-বিদেশী যৌথ মালিকানায় প্রতিষ্ঠা হয় ইসলামী ব্যাংক। মানবতাবিরোধী অপরাধে আব্দুল কাদের মোল্লাকে দেয়া ট্রাইব্যুনালের রায়-পরবর্তী সময়ে আন্দোলনকারীদের রোষানলে পড়ে ব্যাংকটি। ব্যাংকের কয়েকটি শাখায় সে সময় হামলার ঘটনাও ঘটে।
জানা গেছে, ইসলামী ব্যাংকের সবচেয়ে বড় অনিয়মের ঘটনা আনন্দ শিপইয়ার্ডকে দেয়া ৫৪৬ কোটি টাকার ঋণ। বাংলাদেশ ব্যাংক আনন্দ শিপইয়ার্ডকে দেয়া ইসলামী ব্যাংকের ৫৩৬ কোটি টাকা ঋণ মন্দ বা ক্ষতিজনক মানে ধরে নিয়ে তিন বছরে সঞ্চিতি সংরক্ষণের সুযোগ দেয়। এ হিসাবে ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে ১৭৮ কোটি ৬৪ লাখ, ২০১৪ ও ২০১৫ সালে একই অঙ্কের অর্থ সঞ্চিতি সংরক্ষণের নির্দেশ দেয়া হয়; এরই মধ্যে যা বাস্তবায়ন হয়েছে। ফলে ব্যাংকটির শেয়ারের দাম বেড়ে ৩০ টাকার আশপাশে লেনদেন হচ্ছে।
২০১৪ সালের হিসাবে ব্যাংকটিতে বিদেশী শেয়ার ৬৬ দশমিক ৩৮ ও দেশী ৩৩ দশমিক ৬২ শতাংশ। বিদেশী শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে ইসলামী ব্যাংক থেকে বিনিয়োগ তুলে নিচ্ছে দুবাই ইসলামিক ব্যাংক (ডিআইবি)। ১৯৮৩ সালে ইসলামী ব্যাংকের প্রতিষ্ঠালগ্নে এর উদ্যোক্তা হিসেবে যুক্ত হয়েছিল ডিআইবি। ব্যাংকটির বিদেশী উদ্যোক্তাদের মধ্যে আরো রয়েছে সৌদি আরবের ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, কুয়েত ফিন্যান্স হাউজ, জর্ডান ইসলামিক ব্যাংক, কাতারের ইসলামিক ইনভেস্টমেন্ট অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ করপোরেশন, বাহরাইন ইসলামিক ব্যাংকসহ বেশকিছু সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান।
২০১২ সালে এইচএসবিসির সহায়তায় ইসলামী ব্যাংকের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং ও জঙ্গি অর্থায়নের প্রমাণ পাওয়া যায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাংকটির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে এইচএসবিসি।
Discussion about this post